ভারতের এক আন্তর্জাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭১টি দেশ।

দক্ষিণ এশিয়ার জলসীমায় এক অভূতপূর্ব নৌশক্তির প্রদর্শনী ও সৌহার্দ্যের মেলবন্ধন দেখল বিশ্ব। ভারতের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল এক আন্তর্জাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭১টি দেশ। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ‘সামুদ্রিক ঐক্য’ গড়ার প্রত্যয়ে আয়োজিত এই মহড়াটি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। মহড়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে নৌবাহিনীর গর্বিত ফ্রিগেট যুদ্ধজাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’।

আন্তর্জাতিক এই নৌ মহড়া বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ’ (IFR)-এর আদলে আয়োজিত এই ইভেন্টটি কেবল সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি হয়ে ওঠে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির মিলনমেলা। বাংলাদেশ ছাড়াও এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের মোট ৭১টি দেশ। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০টি দেশ তাদের আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং নেভাল অ্যাসেট পাঠিয়েছে।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি, সোমবার বাংলাদেশের যুদ্ধজাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ ভারতের নির্ধারিত বন্দরে নোঙর করে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের নৌ-সম্পর্কের গভীরতা আরও একবার প্রমাণিত হলো। বিশাল এই আয়োজনে বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজের উপস্থিতি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে এক ভিন্ন মাত্রা দান করেছে।

বাংলাদেশের নৌবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী ফ্রিগেট ‘বানৌজা সমুদ্র অভিযান’ এই মহড়ায় অংশ নেওয়া দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। সোমবার জাহাজটি মহড়াস্থলে পৌঁছালে ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সেটিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ‘সমুদ্র অভিযান’ কেবল একটি যুদ্ধজাহাজ নয়, এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতীক। এই জাহাজের নাবিক ও কর্মকর্তারা মহড়ায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন দেশের নৌসেনাদের সঙ্গে পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে সহায়ক হবে।

মহড়ায় অংশ নেওয়া অন্যান্য দেশের যুদ্ধজাহাজগুলোও ছিল দেখার মতো। ইন্দোনেশীয় নৌবাহিনী তাদের অত্যাধুনিক ফ্রিগেট যুদ্ধজাহাজ ‘কেআরআই বুং তোমো-৩৫৭’ (KRI Bung Tomo-357) নিয়ে উপস্থিত হয়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নৌশক্তির জানান দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠায় তাদের যুদ্ধজাহাজ ‘আল ইমারাত’। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ডের যুদ্ধজাহাজগুলোর উপস্থিতি ভারত মহাসাগরে একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা বলয় তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারত তাদের নৌ-সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রদর্শনী করে। মহড়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিমানবাহী রণতরী বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ (INS Vikrant)। সাগরের বুকে ভাসমান এই বিশাল বিমানবন্দরটি ভারতের আত্মনির্ভরশীলতা এবং সামরিক শক্তির এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে মহড়ায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

এই মহড়ার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সামুদ্রিক ঐক্য’ বা Maritime Unity। মহড়া শুরুর আগে এবং জাহাজগুলোর সালাম গ্রহণকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে সামরিক শক্তির চেয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের ওপর বেশি জোর দেন।

রাষ্ট্রপতি মুর্মু বলেন, “এই মহড়া আসলে সামুদ্রিক ঐতিহ্যের প্রতি বিভিন্ন দেশের আস্থা, ঐক্য এবং শ্রদ্ধার প্রতিফলন। আজ আমাদের সামনে ভিন্ন ভিন্ন দেশের পতাকাবাহী যেসব জাহাজ ভাসছে এবং ভিন্ন ভিন্ন ইউনিফর্ম পরিহিত নৌসেনারা দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা মূলত ঐক্যের চেতনাকেই তুলে ধরছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের এই মহড়ার থিম ‘সামুদ্রিক ঐক্য’। সম্মিলিত এই নৌবাহিনীর সংকল্প সাগরের যেকোনো বাধা বা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম। এটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, আমরা আলাদা জাতি হতে পারি, কিন্তু সমুদ্র আমাদের একসূত্রে গেঁথেছে।”

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য বর্তমান সময়ে সাগরপথে জলদস্যুতা, মানবপাচার এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই আয়োজন কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বার্তা। ভারত মহাসাগর বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এই রুটে হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। তাই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সকল দেশের জন্যই জরুরি। ৭১টি দেশকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা ভারতের কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার বড় প্রমাণ।

বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এই মহড়ায় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা এবং মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হয়। এমন আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশগ্রহণের ফলে বাংলাদেশের নৌসেনারা আধুনিক রণকৌশল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং যৌথ অভিযান সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ করতে পারেন।

 ‘সমুদ্র অভিযান’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সামুদ্রিক কূটনীতিতে বা ‘নেভাল ডিপ্লোমেসি’তে নিজেদের সক্রিয় অবস্থান জানান দিল। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার জন্য এটি ছিল একটি চমৎকার মঞ্চ।

মহড়া চলাকালীন বিভিন্ন সেশন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং অপারেশনাল ডেমোনস্ট্রেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে করে এক দেশের নাবিকরা অন্য দেশের সংস্কৃতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। ভারতের ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ এবং বাংলাদেশের ‘সমুদ্র অভিযান’ পাশাপাশি অবস্থান করে যেন দক্ষিণ এশিয়ার দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর অটুট বন্ধনকেই নির্দেশ করছে। পরিশেষে বলা যায়, ভারতের এই আন্তর্জাতিক নৌ মহড়া বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এক জোরালো অবস্থান। অস্ত্রের ঝনঝনানির যুগে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ঐক্যের বাণী এবং ৭১টি দেশের নৌবাহিনীর এই সম্মিলিত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সংঘাত নয়, বরং সহযোগিতাই সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশের ‘সমুদ্র অভিযান’ সেই সহযোগিতার যাত্রায় এক গর্বিত অংশীদার হয়ে রইল। আগামী দিনগুলোতে এই মহড়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের জলসীমা রক্ষায় আরও দক্ষ ও পারদর্শী হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন