পবিত্র মাহে রমজানের শুভাগমন উপলক্ষে রাজশাহীর তানোরে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির তানোর উপজেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। বুধবার বিকেলে তানোর উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে এই র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
বুধবার দুপুরের পর থেকেই তানোর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মডেল মসজিদ চত্বরে সমবেত হতে শুরু করেন। আসরের নামাজের পর ‘খোশ আমদেদ মাহে রমজান’ এবং ইসলামের বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজিত এই শোভাযাত্রাটি উপজেলা মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে গোল্লাপাড়া বাজার প্রদক্ষিণ করে। এরপর মিছিলটি তানোর থানা মোড় হয়ে পুনরায় একই স্থানে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন ও ব্যানার শোভা পায়। র্যালিটি চলাকালীন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনতাকেও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়।
উক্ত শোভাযাত্রায় প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন এবং উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবির রাজশাহী জেলা সেক্রেটারি আব্দুল মমিন। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাবেক জেলা সভাপতি রমজান আলী।
স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তানোর পূর্ব শাখার সভাপতি তহিদুল ইসলাম এবং তানোর দক্ষিণ শাখার সভাপতি রাফিউল ইসলামসহ উপজেলা ও বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীল নেতারা।
র্যালি পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা মাহে রমজানের তাৎপর্য, আত্মশুদ্ধি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাজশাহী জেলা সেক্রেটারি আব্দুল মমিন বলেন, “মাহে রমজান মুমিনের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার। এই মাস কেবল উপবাস থাকার মাস নয়, বরং এটি আত্মসংযম, তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন এবং মানবিক গুণাবলি বিকাশের মাস। দীর্ঘ এগারো মাসের পাপাচার ও আবর্জনা ধুয়ে-মুছে নিজেকে পবিত্র করার সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে রমজান। আমাদের এই শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে এই পবিত্র মাসের আগমনের বার্তা দেওয়া এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।”
তিনি আরও বলেন, “রমজান আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করে গরিব-দুঃখী মানুষের ব্যথানুবুতি অনুভব করতে হয়। এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবানদের উচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।”
সাবেক জেলা সভাপতি রমজান আলী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বর্তমান সময়ে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। যুবসমাজকে এই অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়তে রমজানের শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ছাত্রশিবির চায় এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে, যারা হবে সৎ, দক্ষ এবং দেশপ্রেমিক। রমজান সেই চরিত্র গঠনের শ্রেষ্ঠ সময়।”
শোভাযাত্রা শেষে অনুষ্ঠিত পথসভায় বক্তারা রমজানের পবিত্রতা রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক অনাচার রোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তানোর পূর্ব শাখার সভাপতি তহিদুল ইসলাম বলেন, “রমজানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হয় এমন যেকোনো অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সাধারণ মানুষ যাতে কষ্টে না থাকে, সেজন্য ব্যবসায়ী ভাইদের প্রতি আমরা অনুরোধ জানাই, আপনারা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশা ত্যাগ করে রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখুন।”
তানোর দক্ষিণ শাখার সভাপতি রাফিউল ইসলাম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “ছাত্রশিবির সবসময় ছাত্রসমাজের নৈতিক মানউন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। রমজান মাসে আমাদের কর্মীদের দায়িত্ব হলো কুরআন অধ্যয়ন করা এবং কুরআনের আলোয় নিজের জীবন ও সমাজকে আলোকিত করা। আমরা আশা করি, তানোরের প্রতিটি শিক্ষার্থী এই রমজানে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলবে।”
ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই বর্ণাঢ্য র্যালিটি তানোরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। দীর্ঘ দিন পর রাজপথে এমন সুশৃঙ্খল ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ শোভাযাত্রা দেখে স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেন। গোল্লাপাড়া বাজারের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, “রমজান আসার আগে এমন আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পবিত্র মাসটি কড়া নাড়ছে। এটি আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে। বিশেষ করে তরুণদের এমন সুশৃঙ্খল পদচারণা দেখে ভালো লাগছে।”
পরিশেষে, দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা এবং মুসলিম উম্মাহর সুখ-সমৃদ্ধি প্রার্থনা করে মোনাজাতের মাধ্যমে কর্মসূচরি সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন রমজান সবার জীবনে বয়ে আনবে অনাবিল শান্তি এবং সমাজ থেকে দূর করবে সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও পাপাচার। ইসলামী ছাত্রশিবির তানোর শাখা রমজান মাসজুড়ে সাহরি ও ইফতার বিতরণ, কুরআন শিক্ষা আসর এবং গরিব শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়।
এভাবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে তানোরে মাহে রমজানকে স্বাগত জানাল ইসলামী ছাত্রশিবির। তাদের এই উদ্যোগ যুবসমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
