দেশের দক্ষিণাঞ্চালের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বরিশালে পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। এবার খোদ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মারধরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল সদর-৫ আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারের ভাই মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে এক শ্রমিক নেতাকে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার রাতে বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী শ্রমিক নেতার নাম আরজু মৃধা। তিনি বরিশাল জেলা শ্রমিক দলের সদস্য এবং নথুল্লাবাদ শ্রমিক ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ক্ষমতার পালাবদলের পরেও পরিবহন সেক্টরে পুরনো কায়দাতে পেশিশক্তির মহড়া এবং দখলদারিত্বের চেষ্টার অভিযোগে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে হঠাৎ করেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের বর্তমান সভাপতি মোশারফ হোসেন তার দলবল নিয়ে শ্রমিক নেতা আরজু মৃধার ওপর চড়াও হন। ইউনিয়ন কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়। খবরটি বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়লে টার্মিনাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শ্রমিকদের একাংশ উত্তেজিত হয়ে উঠলে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই ঘটনাস্থলে দ্রুত উপস্থিত হয় পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টহল দল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশারফ হোসেন এবং মারধরের শিকার আরজু মৃধাসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজনকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে উভয় পক্ষকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়ে এবং মুচলেকা নিয়ে ঘণ্টাখানেক পর ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এই ঘটনায় টার্মিনালের সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রতিযোগিতা। স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনপি নেতা ও সদ্য নির্বাচিত এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারের ভাই মোশারফ হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং প্রভাব খাটিয়ে বাস মালিক গ্রুপের ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি হিসেবে নিজের নাম ঘোষণা করেন।
তবে সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পরিবহন খাতের সংস্কার না করে উল্টো বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসরদের নিয়েই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বরিশালের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা সাদিক আবদুল্লাহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোস্তফা কামালকে দিয়ে তিনি ইউনিয়ন পরিচালনা করছেন। সাধারণ শ্রমিকদের অভিযোগ, গত ১৭ বছর ধরে যারা রাজনৈতিক কারণে নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, মোশারফ হোসেনের নতুন কমিটিতে তাদের মূল্যায়ন তো করা হয়ইনি, উল্টো তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের চিহ্নিত চাঁদাবাজদের পুনর্বাসিত করার এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন তৃণমূলের শ্রমিক ও মালিকরা।
মারধরের শিকার শ্রমিক নেতা আরজু মৃধা গণমাধ্যমের কাছে নিজের ওপর হওয়া হামলার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, “আমি গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমরা আশা করেছিলাম ৫ আগস্টের পর অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু এমপির ভাই মোশারফ হোসেন বিগত দিনে দলের কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে না থেকেও শুধুমাত্র আত্মীয়তার প্রভাবে বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি বনে গেছেন। তিনি এসেই আওয়ামী লীগের গুন্ডাদের নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন।”
ঘটনার বিবরণ দিয়ে আরজু মৃধা আরও বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই আমি এই অনিয়মের প্রতিবাদ করে আসছিলাম, যার কারণে আমাকে শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হতো। মঙ্গলবার রাতে আমি দীর্ঘ দিন পর কার্যালয়ে গিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে চা খাচ্ছিলাম। কোনো উস্কানি ছাড়াই হঠাৎ মোশারফ হোসেন এবং তার সহযোগী কথিত সাধারণ সম্পাদক মোস্তফাসহ কয়েকজন এসে আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। আমাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। আমার অপরাধ, আমি কেন ইউনিয়নে এসেছি এবং কেন তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি।”
অন্যদিকে, মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেননি অভিযুক্ত বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশারফ হোসেন। তবে তিনি ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তার দাবি, তিনি দখলদারিত্ব ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। মোশারফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে কিছু লোক নিজেদের ‘সমন্বয়ক’ পরিচয় দিয়ে সমিতিতে চাঁদাবাজি করার চেষ্টা করছিল। আরজু মৃধা এদের প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন এবং সহযোগিতা করছিলেন।”
তিনি আরও দাবি করেন, “মঙ্গলবার রাতে আরজু মূলত শ্রমিক ইউনিয়ন দখল করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কার্যালয়ে এসেছিলেন। তিনি জোর করে শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে বসে দখলদারিত্ব কায়েম করতে চেয়েছিলেন। কেউ যদি জোর করে দখল করতে আসে, তাকে তো আর আদর-আপ্যায়ন করে সরানো সম্ভব নয়। তাই তাকে হালকা মারধর করে ইউনিয়ন অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।” তার এই বক্তব্যে আইনের তোয়াক্কা না করে নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, যা নিয়ে সচেতন মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আব্দুস সালাম জানান, ঘটনাটি মূলত শ্রমিক ইউনিয়নের চেয়ারে বসা নিয়ে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে বিষয়টি মিমাংসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে টার্মিনাল এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে।”
