কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হাসনাত আব্দুল্লাহ শপথ গ্রহণের পরপরই নিজ নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জঞ্জাল ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি থেকে দেবিদ্বারকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। বিশেষ করে মঙ্গলবার রাতে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি যে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন, তা দেবিদ্বারের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
মঙ্গলবার রাতে দেবিদ্বারের নিউমার্কেট এলাকার সাধারণ দোকান মালিকরা অভিযোগ করেন যে, বাজার ইজারার নামে নির্ধারিত সীমানার বাইরেও জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এই অভিযোগ সরাসরি নবনির্বাচিত এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর কাছে পৌঁছালে তিনি কালবিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি সরাসরি মোবাইল ফোনে কথা বলেন বাজার ইজারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শাহ আলমের সঙ্গে।
ফোনালাপের সময় এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইজারাদারকে সতর্ক করে দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট কাঁচাবাজার এলাকার ভেতরেই কেবল ইজারার টাকা তোলা যাবে। এর বাইরে ফুটপাত, সাধারণ দোকানপাট বা অন্য কোনো স্থান থেকে চাঁদা তোলার কোনো সুযোগ নেই।
ফোনালাপে এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যটি ছিল অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন। তিনি ইজারাদারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনি কাঁচাবাজারের ইজারা নিয়েছেন। নির্দিষ্ট বাজার এলাকার ভেতরেই ইজারার টাকা তুলবেন। এর বাইরে যদি চাঁদা নিতে আসেন এবং তখন পাবলিক ধরে পিটাবে, তখন আমার কিছু করার থাকবে না।”
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, অন্যায্য চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনগণ যদি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তবে সেই পরিস্থিতির দায়ভার কোনোভাবেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি বা তার প্রশাসন নেবে না। এটি পরোক্ষভাবে চাঁদাবাজদের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা—জনগণ এখন জাগ্রত এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তারা প্রস্তুত।
শুধুমাত্র ইজারাদারকে সতর্ক করেই ক্ষান্ত হননি এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি উপস্থিত ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনতার উদ্দেশ্যেও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি চাঁদা তোলে তার নাম শাহ আলম। সে যদি নির্ধারিত এলাকার বাইরে চাঁদা নিতে আসে, তবে তাকে আটকে রাখবেন এবং সরাসরি পুলিশে সোপর্দ করবেন।”
তিনি দেবিদ্বারের পুলিশ প্রশাসনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেবিদ্বারের মাটিতে কোনো চাঁদাবাজের ঠাঁই হবে না। শুধু চাঁদাবাজই নয়, যারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা অন্য কোনোভাবে এসব চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এই ঘোষণার ফলে দেবিদ্বারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ভীতি দূর হতে শুরু করেছে।
শপথ নেওয়ার পরপরই ঢাকার আয়েশি জীবন বেছে না নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ ছুটে এসেছেন তার নির্বাচনী এলাকা দেবিদ্বারে। তিনি বিভিন্ন গ্রাম, পাড়া-মহল্লা পরিদর্শন করছেন এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনছেন। গতানুগতিক রাজনৈতিক নেতাদের মতো দূরুত্ব বজায় না রেখে তিনি মিশে যাচ্ছেন আমজনতার কাতারে। তার এই জনসংযোগ কার্যক্রম মূলত নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নেরই একটি অংশ। তিনি মানুষকে আশ্বস্ত করছেন যে, দেবিদ্বারে আর কোনো বৈষম্য বা শোষণের স্থান হবে না।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় হাসনাত আব্দুল্লাহ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন। দেবিদ্বারে ফিরে তিনি সেই প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, আগামী মার্চের মধ্যেই শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, তাদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া আমাদের নৈতিক কর্তব্য। আগামী মার্চের মধ্যে শহীদ পরিবারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব।” তার এই ঘোষণা শহীদ পরিবারগুলোর মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেবিদ্বারের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির যে অলিখিত নিয়ম চলে আসছিল, হাসনাত আব্দুল্লাহর এই কঠোর অবস্থান তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, নবনির্বাচিত এমপির এই সাহসী ভূমিকা দেবিদ্বারকে একটি আধুনিক, নিরাপদ এবং ব্যবসা-বান্ধব জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
নিউমার্কেটের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইটিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা এতদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারতাম না। ইজারার নাম করে আমাদের ওপর জুলুম চলত। আজ এমপি সাহেবের এই কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদের অভিভাবক এসেছেন। আমরা এখন নির্ভয়ে ব্যবসা করতে পারব।”
হাসনাত আব্দুল্লাহর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তন নয়, বরং ব্যবস্থার পরিবর্তন চান। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তার এই ‘জিহাদ’ এবং সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের এই প্রক্রিয়া যদি অব্যাহত থাকে, তবে দেবিদ্বার অচিরেই কুমিল্লার বুকে এক আদর্শ নির্বাচনী এলাকা হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। পুলিশ প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেবিদ্বার সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা ইটিসি বাংলার।
