গাজা উপত্যকা এখন এক মৃত্যুপুরী। গত কয়েক মাস ধরে চলা অবিরাম হামলায় ফিলিস্তিনের এই ভূখণ্ডটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আকাশ থেকে ফেলা বোমায় ধূলিসাৎ হয়েছে হাজার হাজার আবাসিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও মাঝেমধ্যে এমন কিছু সত্য সামনে আসে, যা মানুষের বিবেকে প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ফুটেজ বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। মার্কিন ইউটিউবার জেফ ডেভিডসনের সঙ্গে এক লাইভ আলাপচারিতায় এক ইসরায়েলি সেনা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় স্বীকার করেছেন যে, তারা গাজায় কেবল নারী ও শিশুদের হত্যাই করছেন না, বরং ধর্ষণও করছেন। যুদ্ধের ময়দান থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের দলিল হিসেবে সামনে এসেছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনিরা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করে আসছিল যে, ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে অনেক সময় এই অভিযোগগুলো পশ্চিমা মিডিয়ায় ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে এবার খোদ ইসরায়েলি সেনার মুখ থেকেই বেরিয়ে এলো সেই ভয়াবহ সত্য। মার্কিন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ইউটিউবার জেফ ডেভিডসন, যিনি শর্ট ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হন, তার একটি সেশনে যুক্ত হন গাজায় অবস্থানরত এক ইসরায়েলি সেনা। তাদের কথোপকথনের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে এই লোমহর্ষক তথ্য।
ভিডিওর শুরুতে ডেভিডসন ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। উত্তরে ওই ব্যক্তি নির্দ্বিধায় জানান, তিনি ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)-এর একজন সদস্য এবং বর্তমানে গাজার অভ্যন্তরে একটি অপারেশনাল জোনে অবস্থান করছেন। তার চোখে-মুখে যুদ্ধের কোনো ক্লান্তি বা অনুশোচনা ছিল না, বরং ছিল এক ধরণের পৈশাচিক গর্ব।
আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ওই সেনা তার মোবাইল বা ক্যামেরার লেন্স ঘুরিয়ে গাজার বর্তমান পরিস্থিতির দৃশ্য দেখান। ভিডিওতে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া ধ্বংসস্তূপ। যেখানে একসময় বহুতল ভবন, মানুষের কোলাহল আর জনবসতি ছিল, সেখানে এখন কেবলই ইট-পাথরের পাহাড়।
দৃশ্যটি দেখিয়ে ওই সেনা অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে বলেন, “গাজা দেখতে চান? অবাক হবেন না, এখানে আর কোনো বাড়ি নেই। সব সমান, আমরা সবকিছু পুরোপুরি সমান করে দিয়েছি।”
ডেভিডসন যখন বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন, “আপনারাই কি সব গুঁড়িয়ে দিয়েছেন?” তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ওই সেনা উত্তর দেন, “হ্যাঁ।” তার এই উত্তরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
কথপোকথনের সবচেয়ে জঘন্য ও ভয়াবহ অংশটি আসে এরপর। জেফ ডেভিডসন যখন ওই সেনাকে বেসামরিক হত্যা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ডেভিডসন সরাসরি অভিযোগ করেন যে, আইডিএফ নারী ও শিশুদের টার্গেট করছে। তিনি বলেন, “তুমি একদল নারী ও শিশুকে হত্যা করেছ, এজন্য তোমাকে ধিক্কার জানাই।”
সাধারণত এ ধরনের অভিযোগে যে কেউ আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওই ইসরায়েলি সেনা যা বললেন, তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছে বিশ্ববিবেক। ডেভিডসনের অভিযোগের জবাবে তিনি অত্যন্ত শীতল ও নিরাবেগ কণ্ঠে বলেন, “আমরা নারী ও শিশুদের হত্যা করেছি।” এরপর তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে যোগ করেন, “আর হ্যাঁ, আমরা তাদের ধর্ষণও করেছি।”
তার বাচনভঙ্গি এবং স্বীকারোক্তির ধরণ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, যেন এটি কোনো অপরাধ নয়, বরং তাদের রুটিন কাজের অংশ। “আমরা কেবল হত্যাই করি না, আমরা ধর্ষণও করি”—এই একটি বাক্য গাজায় চলমান মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের গভীরতা কতটুকু, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
এই ভিডিও ফুটেজটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকে লাখ লাখ মানুষ এই ভিডিওটি শেয়ার করছেন এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। নেটিজেনরা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ স্বীকারোক্তি নয়, এটি গণহত্যার এবং যুদ্ধাপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ।
অনেকে মন্তব্য করেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব যখন ইসরায়েলকে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’-এর দোহাই দিয়ে সমর্থন দিচ্ছে, তখন তাদের সেনারা মাঠে কীভাবে পৈশাচিকতায় মেতে উঠেছে, এই ভিডিও তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো সভ্য দেশের সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে ধর্ষণের কথা স্বীকার করতে পারে, তা অকল্পনীয়। এই ঘটনা জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
ভিডিওটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-তে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের শুনানি চলছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, যৌন সহিংসতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই নারী ও শিশু।
এই ভিডিও ফুটেজটি সেই পরিসংখ্যানের পেছনের নির্মম সত্যকেই নিশ্চিত করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা ‘ইমপিউনিটি’ এতটাই প্রবল যে, তারা লাইভ ভিডিওতে এসেও যুদ্ধাপরাধের কথা স্বীকার করতে ভয় পায় না। তারা মনে করে, তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে না।
জেফ ডেভিডসনের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনার এই কথোপকথন কেবল একটি ভিডিও নয়, এটি বর্তমান সময়ের এক ভয়াবহ দলিল। গাজায় যে মানবিক বিপর্যয় ঘটছে, তা কেবল বোমার আঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যৌন সহিংসতা এবং চরম মানসিক বিকৃতি। বিশ্বনেতৃবৃন্দ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি এই স্বীকারোক্তির পরেও নীরব থাকবেন, নাকি এই পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেবেন—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে ইতিহাসের পাতায় এই স্বীকারোক্তি ইসরায়েলি আগ্রাসনের এক কালো অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে। গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া কান্না আর এই দম্ভোক্তি বিশ্ববিবেকের কাছে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে।
