যখন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়ে দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বড়সড় বোমা ফাটালেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে গঠিত সরকার ও বিরোধী দলের সমীকরণকে তিনি ‘বাটোয়ারার নির্বাচন’ বা ভাগাভাগির নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম এই তাত্ত্বিক নেতা তার পোস্টে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ছাত্র সমাজের আত্মত্যাগ এবং বিপ্লবের চেতনা যেভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে হারিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিস্ফোরক মন্তব্যমাহফুজ আলম তার ফেসবুক পোস্টে সরাসরি লিখেছেন, “নির্বাচনী বাটোয়ারা মেনে নিয়ে এখন বিরোধিতার নাটক করা বন্ধ করেন। বাটোয়ারা করে দেয়া আর মেনে নেয়ারা একদিকে, আর জনগণ অন্যদিকে।”
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যে আসন বিন্যাস বা ফলাফল দেখা গেছে (বিএনপি ২১২, জামায়াত ৬৮), তা কোনো স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ফল নয়, বরং এটি একটি পূর্বনির্ধারিত সমঝোতা বা ‘বাটোয়ারা’। তিনি মনে করেন, যারা এই ভাগাভাগির নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকার বা বিরোধী দলে বসেছে, তারা মূলত জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সেই বিপ্লবের ফসল ঘরে তোলার আগেই ছাত্র নেতাদের একাংশের মূলধারার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া বা আপসকামিতা নিয়ে মাহফুজ আলম তার হতাশা গোপন করেননি। তিনি লিখেছেন, “দুঃখ লাগে, ছাত্রদের জন্য। কত কম দামে তাদেরকে বিক্রি করে দিল!”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাহফুজ আলমের এই তীর মূলত সেই সব ছাত্র নেতাদের দিকে, যারা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ না করে ক্ষমতার অংশীদার হতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিংবা ছাত্র সমাজের যে অংশটি এই নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে, তাদের প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করতে পারেন। বিপ্লবের পর যে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা এই ‘বাটোয়ারার নির্বাচন’-এর মাধ্যমে ধূলিসাৎ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সাবেক এই উপদেষ্টা বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করেন, জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইকে মিডিয়া ম্যানিপুলেশন বা সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ এবং পিআর (জনসংযোগ) ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে।
তিনি তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, “জনগণের ন্যায্য লড়াই এখন এরা হাপুস করে দিবে পিআর ক্যাম্পেইন আর মিডিয়া ম্যানিপুলেশনের দৌলতে। আল্লাহ এ দেশের জনগণকে রক্ষা করুন।”
তার এই শঙ্কা প্রকাশ করে যে, নতুন সরকার এবং বিরোধী দল মিলে এমন এক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করবে, যেখানে প্রকৃত সত্য বা জনগণের মূল দাবিগুলো হারিয়ে যাবে চটকদার বিজ্ঞাপনী প্রচারণার আড়ালে।
মাহফুজ আলম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে থাকাকালীন সবসময়ই রাষ্ট্র সংস্কার এবং পুরাতন রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি তথাকথিত ‘পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’ বা রাজনৈতিক সমঝোতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। আজকের এই স্ট্যাটাস প্রমাণ করে যে, তিনি বর্তমান নির্বাচনী ফলাফল এবং সরকার গঠন প্রক্রিয়াকে ২০২৪-এর বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন।
আজ যখন একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করছে এবং অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে, তখন মাহফুজ আলমের মতো ‘বিপ্লবের মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাত ব্যক্তির এই মন্তব্য নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শাসক ও বিরোধী দল—উভয়েই এখন এক কাতারে (বাটোয়ারা করে দেয়া আর মেনে নেয়া), আর সাধারণ জনগণ রয়ে গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে।
মাহফুজ আলমের এই স্ট্যাটাস মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে গেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদল নেটিজেন তার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলছেন, বিপ্লবের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়নি, বরং ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে মাত্র। তারা মনে করছেন, ছাত্ররা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখন তাদের সস্তায় ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নবনির্বাচিত সরকারের সমর্থকরা তার এই বক্তব্যকে ‘হতাশাজনিত প্রলাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের মতে, একটি নির্বাচিত সরকার যখন দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন এমন নেতিবাচক মন্তব্য অগণতান্ত্রিক এবং উসকানিমূলক।
তবে, রাজনীতি সচেতন মহল মনে করছেন, মাহফুজ আলমের এই সতর্কতা উপেক্ষা করার মতো নয়। ‘বাটোয়ারার রাজনীতি’ যদি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। মিডিয়া ম্যানিপুলেশন বা পিআর দিয়ে হয়তো সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু জনগণের মনের ক্ষোভ প্রশমন করা সম্ভব কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
শপথের দিনে যখন চারিদিকে অভিনন্দন আর ফুলের তোড়া, তখন মাহফুজ আলমের এই সতর্কবার্তা— “আল্লাহ এ দেশের জনগণকে রক্ষা করুন”— যেন এক অশনি সংকেত হয়ে বাজছে অনেকের কানে।
