বরগুনায় ১৮ মাস পর তালা ভেঙে আ.লীগ অফিস দখল, বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অগ্নিসংযোগ, এলাকায় চরম উত্তেজনা

সারা দেশে যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, ঠিক তখনই বরগুনার বেতাগী উপজেলায় ঘটল এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। দীর্ঘ ১৮ মাস তালাবদ্ধ থাকার পর হঠাৎ করেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা চালিয়েছে দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়। তবে এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সন্ধ্যায় কে বা কারা অফিসে হানা দিয়ে সেই ছবি ও ব্যানার পুড়িয়ে দিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেতাগী উপজেলাজুড়ে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আতংক বিরাজ করছে।


প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে বেতাগী পৌর মার্কেটে অবস্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন কয়েকজন নেতাকর্মী। এদের নেতৃত্ব দেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামাল শামীম।

দীর্ঘদিন ধরে কার্যালয়টি তালাবদ্ধ ছিল। উপস্থিত নেতারা প্রথমে অফিসের মূল দরজার তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেন। ১৮ মাসের ধুলোবালি ঝেড়ে তারা সেখানে দলীয় কার্যক্রম শুরুর ইঙ্গিত দেন। এরপর তারা সঙ্গে নিয়ে আসা শেখ মুজিবুর রহমান ও সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দেওয়ালে টাঙান। শুধু ছবি টাঙানোই নয়, তারা ছবিগুলোতে ফুলের মালা পরিয়ে স্লোগানও দেন। সবশেষে কার্যালয়ের প্রধান ফটকে নতুন করে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই ঘটনার একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, সিফাত সিকদার ও মোস্তফা জামাল শামীম বেশ আস্থার সঙ্গেই তালা ভাঙছেন এবং ছবি টাঙাচ্ছেন। তাদের শরীরী ভাষায় মনে হচ্ছিল, তারা দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে পুনরায় রাজপথে সরব হওয়ার চেষ্টা করছেন।


বিকেলে ছবি টাঙানোর ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একদিকে আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা কর্মীরা কিছুটা চাঙ্গা হওয়ার চেষ্টা করলেও, সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সন্ধ্যার পরপরই ঘটে দ্বিতীয় ঘটনাটি। অজ্ঞাত পরিচয় একদল দুর্বৃত্ত কার্যালয়ে প্রবেশ করে সদ্য টাঙানো শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি এবং দলীয় ব্যানার নামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে কারা এই অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।


ঘটনাটি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বেতাগী উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আহসানুল কবির সোয়েব। তিনি বলেন, “আমরা ফেসবুকে দেখেছি, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা জনরোষ উপেক্ষা করে ১৮ মাস পর আওয়ামী লীগের অফিস খোলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। তারা সেখানে ব্যানার টাঙিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারা করছিল। সন্ধ্যার দিকে খবর পেয়েছি, ক্ষুব্ধ জনতা বা কেউ সেই ব্যানার ও ছবি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা মনে করি, এটি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।”

তিনি আরও বলেন, “দেশে যখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা কায়েম হতে যাচ্ছে, তখন পরাজিত শক্তির এমন আস্ফালন বরগুনার মানুষ মেনে নেবে না।”


নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম এবং কার্যালয় দখল নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুয়েল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, “কার্যালয় খোলা বা সেখানে ছবি ও ব্যানার স্থাপনের বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ আমাদের এ বিষয়ে অবহিত করেনি। তবে অগ্নিসংযোগ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

পুলিশের এমন মন্তব্যে স্থানীয়রা অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে পৌর মার্কেটের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় তালা ভাঙার ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন কীভাবে অজ্ঞাত থাকল, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।


উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর থেকেই সারা দেশের মতো বরগুনার বেতাগীতেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়ে ৫ আগস্টের পর থেকেই বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি তালাবদ্ধ ছিল।

গত ১৮ মাসে দলটির অধিকাংশ শীর্ষ নেতা আত্মগোপনে ছিলেন। অনেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু নেতাকর্মী এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। সোমবারের ঘটনাটি ছিল তাদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা।


আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে যখন বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নিচ্ছে, তখন বরগুনার এই ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে বেতাগী পৌর মার্কেট ও এর আশেপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে যে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক সহিংসতা ফিরে আসে কি না।

আওয়ামী লীগের এই ঝটিকা শো-ডাউন এবং পরবর্তী অগ্নিসংযোগ প্রমাণ করে যে, মাঠের রাজনীতিতে এখনো উত্তাপ কমেনি। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন