শপথ নিলেন বিএনপির নবনির্বাচিত এমপিরা, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ফিরছেন মির্জা আব্বাস

দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে গঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচিত সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল পৌনে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে এই ঐতিহাসিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

শপথ অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় খবর হলো—দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ঢাকা-৮ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। শপথ গ্রহণের পরপরই সচিবালয় এবং সংসদ ভবন এলাকায় তার এই সম্ভাব্য দায়িত্বপ্রাপ্তি নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।


মঙ্গলবার সকাল থেকেই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তাদের অনুসারীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে সংসদ চত্বর। সকাল পৌনে ১১টার দিকে শপথগ্রহণ কক্ষে প্রবেশ করেন বিএনপির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।

প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী স্পিকার শপথ বাক্য পাঠ করালেও, অন্তর্বর্তীকালীন প্রেক্ষাপট ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবার শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়। এরপর সিইসি নাসির উদ্দিন প্রথমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলটির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।

শপথ পাঠ শেষে সংসদ সদস্যরা শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বেশ হাস্যোজ্জ্বল ও আত্মবিশ্বাসী দেখা যায়। একে একে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং নবীন এমপিরা স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।

আজকের শপথ অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মির্জা আব্বাস। ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত এই বর্ষীয়ান নেতা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবেই ফিরছেন না, বরং তার কাঁধে উঠতে যাচ্ছে রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্ব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মির্জা আব্বাসের এই দপ্তরে ফেরাটা অনেকটা ‘ঘরে ফেরার’ মতোই। তিনি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। সে সময় ২০০১ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার সেই মেয়াদের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতেই নতুন সরকারে তাকে একই দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা-৮ আসনটি রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এই আসনের উন্নয়ন এবং আবাসন খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মির্জা আব্বাসের মতো অভিজ্ঞ নেতার ওপরই আস্থা রাখছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। শপথ শেষে বেরিয়ে আসার সময় মির্জা আব্বাসকে তার সহকর্মীরা অভিনন্দন জানান।

জামায়াত ও অন্যান্যদের শপথ এবং ফলাফল বিশ্লেষণ
বিএনপির শপথ গ্রহণের পর পরই জাতীয় সংসদের বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিন পর্যায়ক্রমে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে:

  • বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি): ২০৯টি আসন।
  • বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ৬৮টি আসন।
  • জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): ৬টি আসন।
  • স্বতন্ত্র প্রার্থী: ৭টি আসন।

বাকি ৩টি আসনে আইনি জটিলতা বা স্থগিতাদেশের কারণে ফলাফল ঘোষণা বা নির্বাচন সম্পন্ন হয়নি। এবারের সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর ৬টি আসন পাওয়াকে রাজনীতিতে তরুণদের উত্থান ও নতুন ধারার সূচনা হিসেবে দেখছেন অনেকে।


সংসদ সদস্যদের শপথের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও দিনের সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছে বিকেলের জন্য। আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে শপথ গ্রহণ করবেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা।

ইতোমধ্যেই নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। মির্জা আব্বাস ছাড়াও দলের শীর্ষ নেতারা কে কোন দপ্তরের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। তবে মির্জা আব্বাসের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। দক্ষিণ প্লাজায় শপথ অনুষ্ঠানের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরছে। মির্জা আব্বাসের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তিকরণ ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার শুরু থেকেই প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে চায়। আবাসন সমস্যা সমাধান, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অপরিসীম। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মির্জা আব্বাস এই খাতকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অন্যদিকে, সংসদে ৬৮টি আসন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং ৬টি আসন নিয়ে এনসিপি-এর উপস্থিতি সংসদকে কতটা প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে, সেদিকেও নজর থাকবে দেশবাসীর। সব মিলিয়ে, ১৭ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন