ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ ও সংসদ সদস্যদের পদার্পণে মুখরিত জাতীয় সংসদ এলাকা। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে উৎসবমুখর পরিবেশে শপথ নিলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তেও সংসদে এক বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব না থাকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসন থেকে নবনির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। শপথগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি মন্তব্য করেন, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই এবারের সংসদ গঠিত হয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথবাক্য পাঠ করার পর রুমিন ফারহানা যখন বেরিয়ে আসছিলেন, তখন সাংবাদিকদের ভিড় তাকে ঘিরে ধরে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এবারের সংসদে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নিয়ে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা অত্যন্ত ধীরস্থির ও চিন্তাশীল ভাষায় বলেন, “সংসদ হচ্ছে সকল মত ও পথের মিলনকেন্দ্র। কিন্তু এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। এবার দেশের ৩০ শতাংশ মানুষের রিপ্রেজেন্টেশন (প্রতিনিধিত্ব) থাকবে না, এটা মাথায় রেখেই আমাদের সংসদে বসতে হবে।”
তার এই মন্তব্যে উপস্থিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তিনি মূলত আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বা সমর্থক গোষ্ঠীর কথা ইঙ্গিত করেছেন। বিগত নির্বাচনগুলোতে বর্জন বা পরাজয়ের কারণে আওয়ামী লীগ সংসদে নেই। রুমিন ফারহানা মনে করিয়ে দেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর সংসদে পৌঁছানো জরুরি। তিনি আরও বলেন, “আমরা যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছি, আমাদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল। কারণ, যারা সংসদে নেই, তাদের কথাগুলোও এখন আমাদের শুনতে হবে এবং বলতে হবে।”
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একদলের অনুপস্থিতির সংস্কৃতি নতুন নয়। রুমিন ফারহানা সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আগে সংসদে বিএনপি ছিল না, তখন আমরা বলেছি সংসদ অসম্পূর্ণ। আর এখন আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলো নেই। একে আমি কীভাবে দেখব? এটাকে আমি রাজনৈতিক শূন্যতা হিসেবেই দেখি। একটি কার্যকর সংসদের জন্য শক্তিশালী সরকারি দলের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠস্বর জরুরি। এবার জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে আছে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক স্পেকট্রামের একটা বড় অংশ—বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বাম ঘরানার রাজনীতি—সংসদের বাইরে রয়ে গেল।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রুমিন ফারহানার এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক পরিপক্বতা’ হিসেবে দেখছেন। বিজয়ী দলের অংশ (বা স্বতন্ত্র মিত্র) হয়েও প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতি নিয়ে কথা বলা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচায়ক।
আজকের দিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো রুমিন ফারহানার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বোঝাপড়ার অংশ হিসেবে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা হয়েছিল, যেখানে রুমিন ফারহানাকে সদস্য রাখা হয়।
আজ তিনি কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আজ আমি কেবল আমার নির্বাচনী এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এর জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে শপথ নিয়েছি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আমি আজ শপথ নিইনি।” তবে কেন তিনি ওই শপথ নেননি, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। ধারণা করা হচ্ছে, দলীয় কৌশল বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি আপাতত এই দায়িত্ব থেকে বিরত থাকছেন অথবা পরবর্তীতে শপথ নেবেন।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বিএনপির সাবেক হুইপ এবং সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হলেও, এবারের নির্বাচনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দলীয় মনোনয়ন বা জোটের সমীকরণের বাইরে গিয়ে তার এই ‘স্বতন্ত্র’ অবস্থান এবং বিজয় তাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিগত বছরগুলোতে রাজপথে তার তেজদীপ্ত ভূমিকা এবং টকশোতে যুক্তিনির্ভর তর্কের কারণে তিনি তরুণ প্রজন্মের আইকনে পরিণত হয়েছেন। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদে ফিরে আসা তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যে উঠে আসা ‘৩০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্বহীনতা’ আগামী দিনগুলোতে সংসদের কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার বিষয়। সংসদে বিএনপি জোটের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২১২ আসন) এবং জামায়াতে ইসলামীর বিরোধী দল (৬৮ আসন) হিসেবে অবস্থান—সব মিলিয়ে এক নতুন মেরুকরণ দেখছে বাংলাদেশ।
রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যের শেষে বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যেন আমরা ভুলে না যাই যে, গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যা নয়, বরং সকলের অংশগ্রহণ। যারা বাইরে আছেন, তাদের মতামতকে উপেক্ষা করে দেশ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।”
সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার আগেই রুমিন ফারহানার এই সতর্কবাণী নতুন সরকারকে কতটা প্রভাবিত করে এবং স্পিকারের পরিচালনায় সংসদ কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
