বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ শপথ নিতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন মন্ত্রিসভা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে শপথ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই দেশের শাসনভার আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এবারের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্ব এবং জোটের শরিকদের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখা গেছে। বিশেষ করে টেকনোক্র্যাট কোটায় বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাদের অন্তর্ভুক্তি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কড়া নিরাপত্তায় ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো এলাকা। দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। শপথ অনুষ্ঠানের পর পরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দপ্তর বণ্টন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জ্যেষ্ঠ নেতারা, যারা বিগত বছরগুলোতে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। একইসঙ্গে আগামীর নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে তরুণ ও উদীয়মান নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী, পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন ২৪ জন। এর মধ্যে বিএনপির হেভিওয়েট নেতাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ডা. এজেড এম জাহিদ হোসেনের মতো অভিজ্ঞ নেতারা মন্ত্রিসভায় থাকছেন।
ব্যবসায়ী ও কূটনীতিক মহলে পরিচিত মুখ আবদুল আওয়াল মিন্টু এবং শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদও মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। এছাড়া রাজশাহী অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা মিজানুর রহমান মিনু, সিলেটের খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং বরিশালের জহির উদ্দিন স্বপন ও আসাদুল হাবীব দুলু পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।
মন্ত্রিসভায় বিশেষ চমক হিসেবে থাকছেন টেকনোক্র্যাট কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ড. খলিলুর রহমান। সাবেক এই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকের অন্তর্ভুক্তি সরকারের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিকে সুসংহত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরেক টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন আমিনুর রশিদ।
পূর্ণ মন্ত্রীদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক আমলা ও রাজনীতিবিদ আরিফুল হক চৌধুরী, আফরোজা খানম রিতা, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের সুমন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধি দিপন দেওয়ান, আ ন ম এহসানুল হক মিলন, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, ফরিদ মাহবুব আনাম এবং শেখ রবিউল আলম।
২৪ সদস্যের প্রতিমন্ত্রীর তালিকায় বড় ধরনের চমক রয়েছে। এখানে বিএনপির তরুণ প্রজন্মের নেতাদের পাশাপাশি সমমনা দল ও জোটের নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা একটি ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ সরকারের ইঙ্গিত দেয়।
বিএনপির তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে শামা ওবায়েদ, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এবং ঢাকা দক্ষিণের জনপ্রিয় মুখ ইশরাক হোসেন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। এছাড়া ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের মধ্যে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, আজিজুল বারি হেলাল ও মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পেতে পারেন।
সবচেয়ে আলোচনার বিষয় হলো ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুর এবং জোনায়েদ সাকির মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা ঐক্যকে রাষ্ট্রপরিচালনাতেও ধরে রাখতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়াও এনডিএম-এর ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, যা মন্ত্রিসভায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।
অন্যান্য প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, শরীফুল আলম, ফরহাদ হোসেন আজাদ, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, হাবিবুর রশিদ হাবিব, রাজিব আহসান, মীর শাহে আলম, ফারজানা শারমিন পুতুল, ফরিদুল ইসলাম, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেন, এম এ মুহিত, আহমেদ সোহেল মঞ্জুর, আলী নেওয়াজ খৈয়াম এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় আমিনুল হক।
নতুন সরকারের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে এই মন্ত্রিসভার প্রধান লক্ষ্য। ড. খলিলুর রহমানের মতো টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের অভিজ্ঞতা এবং নুরুল হক নুর বা জোনায়েদ সাকির মতো তরুণ নেতাদের উদ্যম—এই দুয়ের সংমিশ্রণে তারেক রহমান দেশকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সংসদে ২১২টি আসনের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করলেও, ৬৮ আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর উপস্থিতি সংসদকে প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজকের এই শপথগ্রহণ কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা। প্রবীণের অভিজ্ঞতা আর নবীনের শক্তির এই মন্ত্রিসভা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
