৩৬ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের পথে তারেক রহমান

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারী ফলাফলে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দিনভর ভোটগ্রহণ ও রাতভর গণনা শেষে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ঘোষিত ২৬০টি আসনের ফলাফলে বিএনপি ও তার মিত্রজোট একাই ১৯৭টি আসনে জয়লাভ করেছে। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা হলো। দলীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার রাতে ভোটগণনা শেষে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা ধাপে ধাপে ফল ঘোষণা করেন। প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সংসদের অধিকাংশ আসন নিশ্চিত করে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যাজিক ফিগার’ অতিক্রম করেছে।

ঘোষিত ২৬০টি আসনের মধ্যে বিএনপি ও তাদের জোটের প্রার্থীদের ১৯৭টি আসনে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার ফলে দলটির এককভাবে সরকার গঠনে আর কোনো সাংবিধানিক বাধা রইল না। ২৯৯টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন, যা বিএনপি ইতিমধ্যেই অতিক্রম করেছে।

বিএনপির এই বিশাল বিজয়ের ফলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বেও আসছে বড় পরিবর্তন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী সরকার প্রধান। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে। ইতিহাসের পাতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির শাসনামলে কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গত ৩৫ বছর ধরে বাংলাদেশের শাসনভার ছিল দুই নারী নেত্রীর হাতে—বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই ধারায় ছেদ পড়তে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পুনরায় পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটছে।

নির্বাচনের ফলাফলে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এখন পর্যন্ত ৫৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। বিগত কয়েক দশকের নির্বাচনের তুলনায় এটি জামায়াতের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত-এনসিপি জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৪টি আসনে জয়ী হয়েছেন। বাকি ৩৯টি আসনের ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া এখনো চলছে।

নিরঙ্কুশ বিজয়ের খবর নিশ্চিত হওয়ার পরও বিএনপি অত্যন্ত সংযত আচরণের নির্দেশ দিয়েছে দলের নেতাকর্মীদের। দলটির হাইকমান্ড থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনের জয় উদযাপন উপলক্ষে কোনো প্রকার বিজয় মিছিল বা আনন্দ শোভাযাত্রা করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জনদুর্ভোগ এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির প্রেস উইং এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের লক্ষ্যে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বাদজুমা সারা দেশের মসজিদগুলোতে শুকরিয়া আদায় ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়েও সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করার জন্য দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিজয়ের আনন্দে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে সারা দেশে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং বিরতিহীনভাবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে। শীতের সকাল উপেক্ষা করে ভোটাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে গণনা কার্যক্রম শুরু হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে ফলাফল পৌঁছাতে থাকে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, এবার ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনে বৈধ প্রার্থীর মৃত্যু বা আইনি জটিলতার কারণে নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে। এই ২৯৯টি আসনে মোট ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন ২৭৪ জন।

এবার নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। মোট ৮৩ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যার মধ্যে দলীয় টিকিটে ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ২০ জন নির্বাচনে অংশ নেন।

ভোটার সংখ্যার দিক থেকেও এবারের নির্বাচন ছিল বিশাল। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সম্প্রদায়ের ১ হাজার ২৩২ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা সমাজের মূলস্রোতে তাদের অন্তর্ভুক্তির একটি ইতিবাচক দিক।

এই নির্বাচনে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। বিশ্বের ১২৪টি দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়। যদিও পোস্টাল ব্যালটে ভোট পড়ার হার ও ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়নি, তবুও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়। ২৬০ আসনের ফলাফলেই স্পষ্ট যে, দেশের মানুষ বিএনপি ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে। একইসঙ্গে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের অবস্থান সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে পারে। এখন সবার দৃষ্টি বাকি ৩৯টি আসনের ফলাফলের দিকে এবং পরবর্তী সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর। দীর্ঘ বিরতির পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর শাসনামলে বাংলাদেশ কেমন আগামীর দিকে এগিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন