দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফল ও বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে ২২১৩টি আসন লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পথ সুগম হলো।
অন্যদিকে, নির্বাচনের ফলাফলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়ে আসন্ন সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত-এনসিপি জোট। বিএনপি ও জামায়াতের এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ছিল সাজ সাজ রব। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপির এগিয়ে থাকার খবর আসতে থাকে। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিএনপি এককভাবেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করে ফেলেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিএনপি একাই ২১৩টি আসনে জয়লাভ করেছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে দলটি সংসদে এককভাবে যেকোনো সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিজয় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
বিএনপির এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অভিনন্দনের বার্তা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুত ও ইতিবাচক। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা ৪৮ মিনিটে মার্কিন দূতাবাস তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বিবৃতির মাধ্যমে বিএনপি ও তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানায়।
মার্কিন দূতাবাসের ওই পোস্টে বলা হয়, “একটি সফল ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন। বিএনপি এবং তারেক রহমানকে তাদের ঐতিহাসিক বিজয়ের শুভেচ্ছা।”
যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তাটি শুধুমাত্র শুভেচ্ছার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও ছিল। পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, “আমাদের দুই দেশের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে আপনাদের সাথে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পরদিন সকালেই যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে ‘নিরাপত্তা’ ও ‘সমৃদ্ধি’র মতো শব্দগুলোর ব্যবহার দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত দেয়।
বিএনপির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এক বিশেষ বার্তায় বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আসা এই বার্তায় দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আভাস পাওয়া গেছে।
প্রেসিডেন্ট জারদারি তার বার্তায় উল্লেখ করেন, “পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সর্বদাই সমর্থন করে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন সরকারের অধীনে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক, প্রতিরক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও জোরদার হবে। ইসলামাবাদ নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে বলেও তিনি জানান।
জারদারি আরও বলেন, “আমি আশা করি ঢাকার নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ এই অঞ্চলজুড়ে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ, স্বাধীন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।”
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বার্তায় ‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতা’র বিষয়টি উল্লেখ করা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের পর বিএনপি সরকারের আমলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেটি এখন দেখার বিষয়।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিরোধী দলের আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের আবির্ভাব। বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করাটা গণতন্ত্রের জন্য জরুরি। ফলাফলে দেখা গেছে, জামায়াত ও এনসিপি জোটবদ্ধভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ফলে তারাই হতে যাচ্ছে দ্বাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, সংসদে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের উপস্থিতি সংসদীয় বিতর্ক ও আইন প্রণয়নে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনবে। তবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্কের রসায়ন কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
এই নির্বাচনের ফলাফল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক বিশাল মাইলফলক। দীর্ঘ সময় ধরে দলের হাল ধরে রাখা এবং নানা চড়াই-উতরাই পার করে দলকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা তার নেতৃত্বের পরিপক্কতার প্রমাণ। কর্মী-সমর্থকদের মাঝে এখন আনন্দের বন্যা। তারা মনে করছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবে।
সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে নতুন মন্ত্রীসভা গঠন এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনা। ২১৩ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি যে ম্যান্ডেট পেয়েছে, তা যেমন সম্মানের, তেমনি দায়িত্বেরও। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর দ্রুত অভিনন্দন বার্তা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে কতটা সফল হয়।
