আজ দেশজুড়ে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আহ্বান নির্বাচন কমিশনের, জুমার নামাজে শামিল কোটি মানুষ

নানা জল্পনা-কল্পনা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ঐতিহাসিক গণভোট। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত এই গণভোটে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং কোনো প্রকার বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই সফলতার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এবং দেশের ভবিষ্যৎ মঙ্গল কামনায় আজ শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সারাদেশে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।

গতকাল বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ ও প্রাথমিক গণনা শেষে রাতে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আহ্বান জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের অনুরোধ জানায়।

নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে পারায় আমরা মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য নির্বাচন কমিশন সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিশেষ করে ভোটারসহ দেশবাসীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।”

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, “দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উত্তরোত্তর উন্নতি কামনা করে শুক্রবার বাদ জুমা দেশের সকল মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে তাদের সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনা আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছে।”

কমিশনের এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদে বিশেষ মোনাজাতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মসজিদগুলোতে খতিব ও ইমামগণ জুমার খুতবায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং দেশ গঠনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা দলীয়ভাবেও নেতাকর্মীদের মসজিদে উপস্থিত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শুকরিয়া আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। ফলে আজকের জুমার নামাজে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মুসল্লিরা মহান আল্লাহর কাছে দেশের স্থিতিশীলতা, নতুন সরকারের সফলতা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রার্থনা করবেন।

নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যই নয়, বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য সকল ধর্মাবলম্বীদের জন্যও প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে যেন সুবিধাজনক সময়ে দেশের মঙ্গলের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি প্রমাণ করে যে, নির্বাচন কমিশন একটি অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিশ্বাসী। ভোটের রাজনীতিতে ভেদাভেদ থাকলেও দেশের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনায় সবাই এককাতারে শামিল হতে পারেন—ইসি সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছে।

নির্বাচন কমিশন তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম সঠিক সময়ে পৌঁছানো ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র‍্যাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে এই পরিবেশ বজায় রেখেছেন।

এছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকারও প্রশংসা করেছে কমিশন। ভোটকেন্দ্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকরা ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করেছেন। দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেছেন, যা ইসির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ধন্যবাদটি দেওয়া হয়েছে ভোটারদের, যারা সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের রায় প্রদান করেছেন।

এবারের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য। কারণ, সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে একটি ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা ছিল। গতকালের শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ প্রমাণ করে যে, ইসি সেই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।

ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি ও তাদের জোট বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে এবং জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে। ক্ষমতার এই পালাবদলের মুহূর্তে দেশে যাতে কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরি না হয়, সেজন্যই আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপনের এই আহ্বান জানানো হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সাধারণত বিজয় মিছিল বা পরাজিত পক্ষের বিক্ষোভে সহিংসতা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন এবং বিজয়ী দলগুলোর পক্ষ থেকে বিজয় মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর বদলে প্রার্থনার আয়োজন করার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় আয়োজিত আজকের এই প্রার্থনা কর্মসূচি নতুন সরকারের যাত্রাপথকে মসৃণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জনগণ চায়, ভোটের মাধ্যমে যে রায় তারা দিয়েছে, তা যেন বাস্তবায়িত হয় এবং দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যায়।

আজ শুক্রবারের জুমার নামাজ শেষে কোটি কোটি হাত যখন একসঙ্গে মোনাজাতে উঠবে, তখন সবার একটাই চাওয়া থাকবে—একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ। নির্বাচন কমিশনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে প্রার্থনায় শামিল হচ্ছে, তা জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের এই সফল সমাপ্তি এবং পরবর্তী এই আধ্যাত্মিক আবহ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ গণতন্ত্র ও সম্প্রীতির পথে অবিচল রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন