আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজনীতি। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে প্রতিটি আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চগড়-১ আসনে (সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী) নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়েছেন ১১–দলীয় ঐক্যজোটের মনোনীত প্রার্থী এবং এনসিপির (NCP) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় পঞ্চগড় জেলা শহরের জালাসী এলাকায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি ভোট চুরির পরিণাম এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
পঞ্চগড় উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এই জনসভায় হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতিতে সারজিস আলম তার স্বভাবসুলভ তেজদীপ্ত ভঙ্গিতে বক্তব্য রাখেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এবারের নির্বাচনে কোনো প্রকার কারচুপি বা জালিয়াতি সহ্য করা হবে না। উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “রক্ত দিয়ে দিবেন, জীবন দিয়ে দেবেন, তবুও একটা ভোট চুরি হতে দেবেন না।”
ভোট কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের পরিণতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “যে ভোট চুরি করার আশায় কেন্দ্রে আসবে, তার একমাত্র ঠিকানা হবে হাসপাতাল। তাকে বাড়ি থেকে শেষ বিদায় নিয়ে আসতে বলবেন।” তার এই বক্তব্যে মাঠজুড়ে স্লোগান ও করতালির ঝড় ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, সারজিস আলমের এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো আসন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কতটা অনড় অবস্থানে রয়েছে।
সারজিস আলম তার বক্তব্যে কেবল প্রতিপক্ষ বা স্থানীয় দুর্বৃত্তদেরই সতর্ক করেননি, বরং নির্বাচন কমিশনকেও (ইসি) সরাসরি লক্ষ্য করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অতীতের নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলতে চাই, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ কিংবা বিন্দুমাত্র কোনো ধরনের নীলনকশা কেউ যদি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন, তবে সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পরিণতি যেন তারা মনে রাখেন।”
তিনি ইঙ্গিত করেন যে, জনগণের ম্যান্ডেট বা রায়কে পাশ কাটিয়ে কোনো প্রশাসনিক কারসাজি করা হলে তা ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে এবং জনগণ তা মেনে নেবে না। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো বিশেষ দলের হয়ে কাজ করার সুযোগ আর নেই।
বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। সারজিস আলম বলেন, “আমরা তাদের স্পষ্ট করে বলতে চাই, অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশ আর চব্বিশের আগের বাংলাদেশকে আপনারা এক কাতার করে দেখবেন না।”
তিনি অভিযোগ করেন, গত দেড়-দুই দশকে দেশে সুস্থ রাজনীতির চর্চা ছিল না। বিরোধী পক্ষকে দমন এবং একতরফা নির্বাচনের যে ‘নোংরা কালচার’ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, “বিগত ষোলো-সতেরো বছরে এই বাংলাদেশে বাস্তববাদী রাজনীতি করার কোনো অভিজ্ঞতা আপনাদের নেই। এই কারণে ২০ বছর আগে আপনারা যেই ধরনের অপসংস্কৃতির নোংরা রাজনৈতিক কালচারের রাজনীতি করেছেন, আপনারা মনে করছেন এখনো সেই রাজনীতি করে আপনারা পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু সেই দিন শেষ।”
পঞ্চগড়-১ আসনটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় সীমান্তবর্তী এই জেলায় এনসিপি এবং ১১-দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে সারজিস আলমের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা চোখে পড়ার মতো। সোমবারের জনসভায় নারীদের উপস্থিতি এবং তরুণদের উদ্দীপনা ছিল লক্ষ্যণীয়।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, সারজিস আলমের এই কঠোর অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যারা ভোট দিতে পারেননি বা ভোটকেন্দ্র বিমুখ ছিলেন, তারা এবার নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। তবে একই সঙ্গে তার ‘হাসপাতাল’ সংক্রান্ত মন্তব্যটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন এটি সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে, আবার তার সমর্থকদের দাবি—ভোট ডাকাতদের দমাতে এমন কঠোর ভাষার বিকল্প নেই।
এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যজোট উত্তরাঞ্চলে নিজেদের দুর্গ গড়ে তুলতে মরিয়া। সারজিস আলম উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হওয়ায় এই অঞ্চলের প্রতিটি আসনে জোটের বিশেষ নজর রয়েছে। জনসভায় জোটের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, পঞ্চগড় থেকে পরিবর্তনের যে ডাক এসেছে, তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সন্ধ্যার আগে শুরু হওয়া এই জনসভা রাত পর্যন্ত চলে। সারজিস আলমের বক্তব্যের পর পুরো পঞ্চগড় শহরজুড়ে মিছিল বের হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, উত্তাপ ততই বাড়ছে। নির্বাচন কমিশন এখন এই ধরনের চ্যালেঞ্জিং বক্তব্য এবং মাঠের পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, সারজিস আলমের এই হুঁশিয়ারি আসন্ন নির্বাচনের মাঠকে আরও সরগরম করে তুলল। ইটিসি বাংলা পঞ্চগড়সহ সারা দেশের নির্বাচনী পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
