বলিউডের ভাইজান খ্যাত সালমান খানের বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘ব্যাটল অফ গালওয়ান’ নিয়ে দর্শকদের উন্মাদনার শেষ নেই। অ্যাকশন ও দেশাত্মবোধক ঘরানার এই ছবিটিকে ঘিরে ভক্তদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। কিন্তু মুক্তির দ্বারপ্রান্তে এসে সিনেমাটিকে ঘিরে দানা বাঁধছে নতুন নতুন জটিলতা। শোনা যাচ্ছে, পূর্বনির্ধারিত সময়ে প্রেক্ষাগৃহে আসছে না ছবিটি। প্রোডাকশন ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ বাকি থাকায় এবং কিছু দৃশ্য নতুন করে শুট করার প্রয়োজনে ছবিটির মুক্তি পিছিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই খবরে সালমান-ভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
ভারতীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সিনেমাটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুনরায় শুটিং করার পরিকল্পনা করছেন নির্মাতারা। পরিচালক অপূর্ব লাখিয়া কোনোভাবেই ছবির মান নিয়ে আপস করতে রাজি নন। যেহেতু ছবিটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীরত্বগাথা এবং গালওয়ান ভ্যালির মতো একটি স্পর্শকাতর ও ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, তাই এর কারিগরি দিক ও দৃশ্যপট নিখুঁত করতে চাইছে টিম।
তাছাড়া, ছবির ভিএফএক্স এবং এডিটিংয়ের মতো পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজেও বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে। সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসে ছবিটি মুক্তি দেওয়া এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রযোজনা সংস্থা ও সালমান খান আপাতত ভারতের স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ১৫ আগস্টকে নতুন মুক্তির সম্ভাব্য ‘ডেডলাইন’ বা লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের আবহে দেশাত্মবোধক এই ছবিটি মুক্তি পেলে তা ব্যবসায়িকভাবেও লাভবান হবে বলে ধারণা করছেন বক্স অফিস বিশ্লেষকরা।
মুক্তির তারিখ পেছানোর বিষয়ে নির্মাতা অপূর্ব লাখিয়া কিংবা প্রধান অভিনেতা সালমান খানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। তবে বলিউডের অন্দরমহলের খবর, খুব শিগগিরই সালমান খান নিজে বা তার প্রযোজনা সংস্থা এসকে ফিল্মস থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। ভক্তরা আশা করছেন, বিলম্ব হলেও ভাইজান বড় পর্দায় এমন কিছু নিয়ে আসবেন যা সব অপেক্ষার অবসান ঘটাবে।
‘ব্যাটল অফ গালওয়ান’ ছবিটি নির্মিত হয়েছে ২০২০ সালের জুন মাসে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে। এই সংঘাত ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের সীমান্তে হওয়া সবচেয়ে বড় সংঘাত। ছবিতে সালমান খান ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৬ বিহার রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল বিকুমল্লা সন্তোষ বাবুর চরিত্রে অভিনয় করছেন, যিনি সেই রাতে চীনা সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
এই চরিত্রের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে গড়েছেন ৬০ বছর বয়সী সালমান। গত কয়েক বছর ধরে তিনি নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছেন। জানা গেছে, একজন সেনা কর্মকর্তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং শারীরিক গঠন ফুটিয়ে তুলতে তিনি কঠোর ডায়েট এবং আর্মি ট্রেনিং সেশনে অংশ নিয়েছেন। ‘টাইগার’ ফ্র্যাঞ্চাইজির পর এটিই হতে যাচ্ছে সালমানের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অ্যাকশন ফিল্ম, তবে এখানে কোনো ফিকশন নয়, বরং বাস্তব ইতিহাসের এক নায়কের ভূমিকায় দেখা যাবে তাকে।
ছবিটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। গত বছর (২০২৫) ২৭ ডিসেম্বর, সালমান খানের জন্মদিনে ছবিটির টিজার মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে চীনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে। টিজারে গালওয়ান সংঘাতের কিছু দৃশ্য এবং ভারতীয় সেনাদের বীরত্ব প্রদর্শিত হওয়ায় বেইজিং বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি।
বাস্তবে ওই সংঘাতে ভারতীয় জওয়ানরা চীনা পিএলএ (পিপলস লিবারেশন আর্মি) বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল এবং চীনের পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে ভারত দাবি করে আসছে। এই সত্যটি সিনেমার পর্দায় উঠে আসায় চীন ক্ষুব্ধ। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারি গণমাধ্যমগুলো অভিযোগ করেছে যে, ‘ভারত বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে উগ্র জাতীয়তাবাদের উস্কানি দিচ্ছে এবং চীনা সামরিক বাহিনীকে বিশ্বমঞ্চে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে।’ গ্লোবাল টাইমসের মতো চীনা সংবাদমাধ্যম ছবিটিকে ভারতের ‘জাতীয়তাবাদী প্রচারের অস্ত্র’ বা প্রোপাগান্ডা ফিল্ম হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ হয়তো ছবিটির মুক্তির প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। সেন্সর বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা এড়াতে নির্মাতারা হয়তো বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
টিজার বিতর্কের মাঝেই সম্প্রতি ছবিটির প্রথম গান ‘মাতৃভূমি’ মুক্তি পেয়েছে। গানটি ইউটিউব ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হয়েছে। গানটির কথা, সুর এবং সালমান খানের আবেগী উপস্থিতি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। গানটি শোনার পর ছবিটির জন্য দর্শকের আগ্রহ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
সালমানের অনুরাগীরা আশা করছিলেন, আর মাত্র মাস দুয়েক পর এপ্রিলে ঈদের মৌসুম বা তার কাছাকাছি সময়ে প্রিয় তারকাকে বড় পর্দায় দেখবেন। কিন্তু হঠাত মুক্তির তারিখ পেছানোর খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা হতাশা প্রকাশ করছেন। তবে অনেকেই বলছেন, তাড়াহুড়ো করে নিম্নমানের কাজ উপহার দেওয়ার চেয়ে সময় নিয়ে একটি মাস্টারপিস তৈরি করাই শ্রেয়।
‘ব্যাটল অফ গালওয়ান’ কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক আবেগের নাম। সালমান খান যখন কর্নেল সন্তোষ বাবুর মতো বীর যোদ্ধার চরিত্রে পর্দায় আসবেন, তখন তা বক্স অফিসে ঝড় তুলবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার। এখন দেখার বিষয়, সমস্ত জটিলতা, রিশুট এবং ভূ-রাজনৈতিক বিতর্ক কাটিয়ে কবে নাগাদ চূড়ান্ত মুক্তির তারিখ ঘোষণা করেন ভাইজান। এপ্রিল নাকি আগস্ট—সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন পুরো বলিউড।
ইটিসি বাংলা বিনোদন ডেস্ক এই বিষয়ে পরবর্তী আপডেটের ওপর কড়া নজর রাখছে।
