আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আজ মুখোমুখি হয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড এবং হিমালয়ের দেশ নেপাল। মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় ইংলিশরা। অভিজ্ঞতার বিচারে ইংল্যান্ড যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও, নেপালের স্পিন আক্রমণ এবং লড়াকু মানসিকতা ম্যাচটিতে বাড়তি উত্তেজনা যোগ করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার জয় হয়েছে প্রথমার্ধে। তরুণ জ্যাকব বেথেল ও অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের অনবদ্য হাফ-সেঞ্চুরি এবং শেষ দিকে উইল জ্যাকসের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৮৪ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছে ইংল্যান্ড। জয়ের জন্য নেপালকে করতে হবে ১৮৫ রান।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ওয়াংখেড়ের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে বড় সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে ইংল্যান্ড। তবে শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না তাদের জন্য। ইনিংসের শুরুতেই নেপালি বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মুখে পড়ে ইংলিশ টপ অর্ডার। দলীয় মাত্র ৫ রানের মাথায় সাজঘরে ফিরতে হয় বিধ্বংসী ওপেনার ফিল সল্টকে। নেপালের পেসারদের সুইং আর গতির কাছে পরাস্ত হয়ে মাত্র ১ রান করেই আউট হন তিনি।
সল্টের দ্রুত বিদায়ে গ্যালারিতে উপস্থিত নেপালি সমর্থকদের উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে সেই চাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি অভিজ্ঞ জস বাটলার। তিন নম্বরে নামা তরুণ তুর্কি জ্যাকব বেথেলকে সঙ্গে নিয়ে পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নেন তিনি। বাটলার তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ব্যাট চালিয়ে ১৭ বলে ২৬ রান করে দলের রানের চাকা সচল রাখেন। কিন্তু পাওয়ার প্লের শেষ দিকে তিনিও আউট হয়ে গেলে ইংল্যান্ড কিছুটা চাপে পড়ে যায়। পাওয়ার প্লের ৬ ওভার শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৫৭ রান।
দুই ওপেনারকে হারানোর পর ইংল্যান্ডের ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন জ্যাকব বেথেল এবং দলের অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। চার নম্বরে নামা টম ব্যান্টন মাত্র ২ রান করে ব্যর্থ হয়ে ফিরলে, দলের হাল ধরেন এই দুই ব্যাটার। তাদের জুটিতেই মূলত ইংল্যান্ড বড় সংগ্রহের ভিত্তি পায়।
তরুণ জ্যাকব বেথেল ছিলেন আজকের দিনের অন্যতম সেরা আবিষ্কার। চাপের মুখেও তিনি অসাধারণ ধৈর্য ও শট সিলেকশনের পরিচয় দেন। নেপালের স্পিনার সন্দীপ লামিচানে এবং দীপেন্দ্র সিং আইরের ঘূর্ণি বলগুলো তিনি দারুণ দক্ষতায় সামাল দেন। মাত্র ৩৫ বলে তিনি তুলে নেন তার ঝড়ো ফিফটি। ৫৫ রানের ইনিংসটি খেলার পথে তিনি মাঠের চারপাশেই দর্শনীয় সব শট খেলেন।
অন্যদিকে, অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক প্রমাণ করেন কেন তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডল অর্ডার ব্যাটার। দলের প্রয়োজনে তিনি একদিকে যেমন উইকেট আগলে রেখেছেন, অন্যদিকে বাজে বল পেলেই সীমানা ছাড়া করেছেন। ব্রুক ৩২ বলে ৫৩ রানের এক দায়িত্বশীল ইনিংস উপহার দেন। এই দুই ব্যাটারের যুগলবন্দীতে ইংল্যান্ডের স্কোরবোর্ড দ্রুত তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছায় এবং নেপালের বোলাররা কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। একটা সময় মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড অনায়াসেই ২০০ রানের গণ্ডি পার করবে। কিন্তু বেথেল ও ব্রুক আউট হওয়ার পর কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। স্যাম কারান উইকেটে এসে সুবিধা করতে পারেননি। ৮ বল খেলে মাত্র ২ রান করে তিনি আউট হলে ইংল্যান্ডের রানের গতি কিছুটা মন্থর হয়ে যায়। নেপালের বোলাররা, বিশেষ করে নন্দন যাদব ও দীপেন্দ্র সিং আইরে মাঝের ওভারগুলোতে দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসেন।
তবে ম্যাচের চিত্রনাট্য পুরোপুরি বদলে দেন উইল জ্যাকস। লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাট করতে এসে তিনি ওয়াংখেড়েতে রীতিমতো টর্নেডো বইয়ে দেন। শেষ তিন ওভারে ইংল্যান্ড তোলে ৪৫ রান, যার সিংহভাগই আসে জ্যাকসের ব্যাট থেকে। মাত্র ১৮ বলে অপরাজিত ৩৯ রানের এক বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন তিনি। তার এই ইনিংসে ছিল ৪টি বিশাল ছক্কা এবং ১টি চার। জ্যাকসের এই ফিনিশিং টাচই ইংল্যান্ডকে ১৮৪ রানের লড়াকু পুঁজি এনে দেয়, যা এই উইকেটে নেপালের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং।
নেপালের বোলারদের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র। শক্তির বিচারে ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে তারা সাহসের সঙ্গেই লড়াই করেছে। বিশেষ করে দীপেন্দ্র সিং আইরে এবং নন্দন যাদব ছিলেন বেশ সফল। তারা দুজনেই ২টি করে উইকেট শিকার করে ইংল্যান্ডের রানের গতিতে লাগাম টানার চেষ্টা করেন। অভিজ্ঞ লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচানে ৪ ওভারে বেশ নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন এবং ১টি উইকেট তুলে নেন। এছাড়া শের মাল্লাও ১টি উইকেট পান। তবে ডেথ ওভারে ইংলিশ ব্যাটারদের, বিশেষ করে উইল জ্যাকসের ঝড় সামলাতে ব্যর্থ হন নেপালি পেসাররা। অতিরিক্ত রান দেওয়া এবং শেষদিকের এলোমেলো বোলিং তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
জয়ের জন্য নেপালকে করতে হবে ১৮৫ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ১৮৫ রান তাড়া করে জেতা অসম্ভব নয়, তবে ইংল্যান্ডের শক্তিশালী বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে এটি নেপালের জন্য হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। জফরা আর্চার, স্যাম কারান এবং আদিল রশিদদের মতো বিশ্বমানের বোলারদের সামলাতে হলে নেপালের টপ অর্ডার ব্যাটারদের অতিমানবীয় কিছু করতে হবে।
নেপালের অধিনায়ক রোহিত পাউডেল এবং ওপেনার কুশল ভুর্তেলের ওপর বড় দায়িত্ব থাকবে। পাওয়ার প্লেতে যদি তারা দ্রুত রান তুলতে পারেন এবং উইকেট ধরে রাখতে পারেন, তবে ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড চাইবে তাদের পেস আক্রমণ দিয়ে শুরুতেই নেপালকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে এবং বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালের পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে। দিনের আলো নিভে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এখন অপেক্ষা শ্বাসরুদ্ধকর এক রান তাড়ার। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের অভিজ্ঞতার কাছে নেপালের তারুণ্য হার মানবে, নাকি ক্রিকেটের নব্য শক্তি হিসেবে নেপাল বিশ্বমঞ্চে নতুন কোনো অঘটন ঘটাবে—তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে ক্রিকেট বিশ্ব।
