সুশান্ত সিং রাজপুতের অকালমৃত্যুর ৭ বছরপর আবার নতুন প্রেমের গুঞ্জন: রিয়া চক্রবর্তী

বলিউডের আকাশে নক্ষত্রপতনের ঘটনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু ২০২০ সালের জুন মাসে অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের অকালমৃত্যু ভারতীয় বিনোদন জগতকে যেভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তার রেশ আজও কাটেনি। সেই ঘটনার পর কেটে গেছে দীর্ঘ প্রায় সাতটি বছর। সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু সুশান্তের মৃত্যুর পর যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল তার প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তীর ওপর দিয়ে, তা আজও জনমানসে এক দগদগে স্মৃতি। মিডিয়া ট্রায়াল, জেল হাজত, সামাজিক বয়কট এবং তীব্র মানসিক যন্ত্রণার সেই দিনগুলো পেরিয়ে রিয়া চক্রবর্তী আজ এক নতুন মানুষ। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রিয়া তার বর্তমান মানসিক অবস্থা, প্রেম, জীবন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন, যা তার ভক্ত ও সমালোচকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।


সাক্ষাৎকারে রিয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন, অতীতের বিভীষিকা তাকে ভেঙেচুরে দিলেও জীবনের প্রতি তার বিশ্বাস পুরোপুরি হরণ করতে পারেনি। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে যে আইনি জটিলতা ও জনরোষ তৈরি হয়েছিল, তা যেকোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাকে ‘খলনায়িকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় চলেছিল লাগাতার ট্রোলিং। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে রিয়া চক্রবর্তী বলছেন, তিনি এখনও ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন।

রিয়া বলেন, “আমি এখনও ভালোবাসায় বিশ্বাস করি। জীবনে অনেক খারাপ সময় গেছে, ঝড় বয়ে গেছে, কিন্তু তাতে আমার প্রেমের ওপর বিশ্বাস নষ্ট হয়নি।” তার এই সহজ স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, ঘৃণা দিয়ে ভালোবাসার অনুভূতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। তিনি আরও জানান, তিনি এখন নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে হতাশ করেনি, বরং আরও বেশি বাস্তববাদী করে তুলেছে।


সুশান্তের মৃত্যুর পর রিয়ার ক্যারিয়ার কার্যত ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। তিনি জানান, সেই সময় বলিউড ইন্ডাস্ট্রি তাকে অঘোষিতভাবে বয়কট করেছিল। তার ভাষায়, “একটা সময় ছিল, যখন প্রায় কেউই আমার সঙ্গে কাজ করতে চাইছিল না। আমি জানতাম না, আদৌ আমি আর কোনোদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারব কি না বা ইন্ডাস্ট্রি আমাকে গ্রহণ করবে কি না।”

প্রযোজক ও পরিচালকরা তাকে কাজে নিতে ভয় পেতেন, পাছে জনরোষ তাদের সিনেমার ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু রিয়া হাল ছাড়েননি। তিনি বলেন, “যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন খুব অল্প কিছু মানুষ আমার পাশে ছিল। তাদের সমর্থনই আমাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহস দিয়েছে।” গত কয়েক বছরে তিনি ধীরে ধীরে পডকাস্ট এবং ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তার পডকাস্ট ‘চ্যাপ্টার ২’ এর মাধ্যমে তিনি নিজের এবং অন্যদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনিয়েছেন, যা শ্রোতাদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে।


২০২০ থেকে ২০২২—এই সময়টা ছিল রিয়ার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। মাদক মামলা থেকে শুরু করে সুশান্তের মৃত্যুর প্ররোচণা—নানা অভিযোগে তাকে বিদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও আইনি প্রক্রিয়ায় অনেক কিছুই এখন স্তিমিত, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের বিচার তাকে মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। তবে রিয়া এখন আর সেই ভুক্তভোগী নারী নন। তিনি নিজেকে একজন ‘সারভাইভার’ বা লড়াকু হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “অতীত আমাকে ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে আমাকে আরও শক্তও করেছে। আমি এখন আর ছোটখাটো ঝড়ে বিচলিত হই না। আমি জানি সত্যটা কী এবং আমি কারা।” রিয়া মনে করেন, যারা তাকে ঘৃণা করেছেন, তারা হয়তো পরিস্থিতির শিকার ছিলেন বা ভুল তথ্যের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাই তাদের প্রতি এখন আর কোনো ক্ষোভ পুষে রাখেননি তিনি। ক্ষমা এবং ভালোবাসাই এখন তার জীবনের মূলমন্ত্র।


বলিউড পাড়ায় মাঝে মাঝেই রিয়া চক্রবর্তীর নতুন প্রেমের গুঞ্জন শোনা যায়। নিখিল কামাত বা অন্যান্যদের সঙ্গে তার নাম জড়ালেও রিয়া সরাসরি কোনো সম্পর্কের কথা স্বীকার করেননি। তবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে “নতুনভাবে জীবন শুরু করার” ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি যে আবারও একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত, তা তার কথায় বোঝা যায়। তিনি বলেন, “মানুষ একা বাঁচতে পারে না। ভালোবাসার প্রয়োজন সবারই আছে। আমিও চাই কেউ আমার হাত ধরুক, কিন্তু সেটা হতে হবে সম্মান ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে।”


রিয়ার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি কেবল একজন অভিনেত্রীর গল্প নয়, বরং এটি সাইবার বুলিং এবং মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হাজারো মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, পৃথিবী যদি আপনার বিরুদ্ধে চলে যায়, তবুও সত্য এবং ধৈর্যের সঙ্গে নিজের অবস্থানে অটল থাকলে একদিন মেঘ কেটে রোদ উঠবেই।

রিয়া তার সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে বলেন, “আমি চাই না কেউ আমাকে করুণা করুক। আমি চাই মানুষ দেখুক যে, ধ্বংসস্তূপ থেকেও ফিনিক্স পাখির মতো উঠে আসা যায়। যারা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের বলব—ধৈর্য ধরুন, সময় সবকিছু বদলে দেয়।”


সাত বছর আগের সেই উত্তাল সময় পেরিয়ে রিয়া চক্রবর্তী আজ অনেক পরিণত। সুশান্ত সিং রাজপুত হয়তো তার স্মৃতিতে আজীবন থাকবেন, কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। আজকের রিয়া চক্রবর্তী সেই জীবনেরই জয়গান গাইলেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ঘৃণা সাময়িক, কিন্তু ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার ইচ্ছা চিরন্তন। বলিউডে তিনি আগের মতো জৌলুস হয়তো এখনও ফিরে পাননি, কিন্তু ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

ইটিসি বাংলার পক্ষ থেকে আমরাও চাই, অতীতের গ্লানি মুছে রিয়া চক্রবর্তী তার নতুন যাত্রায় সফল হোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন