যুবলীগ ‘ক্যাডার’ আরিফের দুর্গে যৌথবাহিনীর হানা, বিদেশি অস্ত্র ও মদের ভাণ্ডারসহ আটক ৪

যশোর শহরের অপরাধ জগতের অন্যতম ত্রাস এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী যুবলীগ ক্যাডার আরিফের সাম্রাজ্যে অবশেষে হানা দিয়েছে যৌথবাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বাড়িতে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে পরিচালিত এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, গুলি, ধারালো অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য।

শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর যশোর শহরের ঢাকারোড বিসিএমসি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় এই অভিযান শুরু হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা এই অভিযানে আরিফ কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, তার অপরাধ জগতের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত ওই বাড়ি থেকে তার দুই ভাই এবং তাদের স্ত্রীসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়েছে। এই ঘটনা যশোর শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।


আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথবাহিনী জানতে পারে যে, শহরের ঢাকারোড এলাকায় আরিফের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র মজুদ রয়েছে এবং সেখানে অপরাধী চক্রের সদস্যরা অবস্থান করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাত ১২টার দিকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর একটি বিশেষ টিম আরিফের বাড়িটি ঘিরে ফেলে।

টানা আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে তল্লাশি অভিযান। বাড়ির প্রতিটি কোণ তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়। তল্লাশিকালে আরিফের গোপন আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, এক রাউন্ড তাজা গুলি, দুটি ধারালো চাপাতি, দুটি চাকু এবং দূরপাল্লার নজরদারির জন্য ব্যবহৃত একটি টেলিস্কোপ। এছাড়া অপরাধ জগত পরিচালনার পাশাপাশি তাদের বিলাসী জীবনের প্রমাণ হিসেবে এক বক্স এয়ারগানের গুলি এবং পাঁচটি বিদেশি মদের বোতলও জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় দুটি মোবাইল ফোনও আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।


অভিযানের আঁচ আগেই টের পেয়ে মূল হোতা যুবলীগ ক্যাডার আরিফ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে যৌথবাহিনী খালি হাতে ফেরেনি। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় আরিফের অপরাধ সাম্রাজ্যের অন্যতম সহযোগী ও তার দুই ভাই—জোয়েব হাসান সাকি ও জাকির হোসেন সাগরকে। এছাড়া বাড়িতে অবস্থানরত আরিফের স্ত্রী লোপা খাতুন এবং সাগরের স্ত্রী তাহেরা আক্তার তানিয়াকেও আটক করা হয়।

অভিযান শেষে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জব্দকৃত অস্ত্র ও মাদকসহ আটক চারজনকে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।


যশোরের সাধারণ মানুষের কাছে আরিফ নামটি এক আতঙ্কের প্রতীক। স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশি নথিপত্র অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আরিফ এবং তার দুই ভাই সাকি ও সাগর যশোর শহরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তারা ছিলেন যুবলীগের প্রভাবশালী এবং দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ক্যাডার।

অভিযোগ রয়েছে, আরিফ ছিলেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তার একটি বিশেষ বাহিনীর প্রধান। এছাড়া শাহীন চাকলাদারের ভাই ফন্টু চাকলাদারের ‘ডান হাত’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন আরিফ। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি যশোর শহরে অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং ভূমি দখলের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়—সবকিছুতেই ছিল আরিফ বাহিনীর হস্তক্ষেপ। তার কথায় এলাকার মানুষ উঠত আর বসত। এর আগেও একাধিকবার তিনি অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।


যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো অত্যন্ত মারাত্মক। আটককৃতদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তাদের আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন করা হবে যাতে এই অস্ত্রগুলোর উৎস এবং পলাতক আরিফের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।”

তিনি আরও জানান, আরিফকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং খুব দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।


শনিবার রাতের এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আরিফ বাহিনীর দীর্ঘদিনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী যৌথবাহিনীর এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা এদের ভয়ে টু শব্দটিও করতে পারিনি। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিত তারা। আজ প্রশাসনের এই পদক্ষেপে আমরা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। তবে মূল হোতা আরিফ গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আতঙ্ক পুরোপুরি কাটছে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সরকারের আমলে যারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের পাহাড় গড়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বড় ভূমিকা রাখবে। আরিফের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টেলিস্কোপ ও বিদেশি অস্ত্র প্রমাণ করে যে, তারা বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি বা সক্ষমতা রাখত।

বর্তমানে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। রোববারের (৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যেই তাদের আদালতে তোলা হবে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন