‘মজলুম থেকে জালিম হবেন না’, বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমিরের কঠোর হুঁশিয়ারি

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই রাজধানী ঢাকার মেরুল বাড্ডায় এক নির্বাচনী জনসভায় রাজনীতির মাঠে নতুন সমীকরণের বার্তা দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামের সমর্থনে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, দুর্নীতি এবং বিগত সময়ের মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।

নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে আয়োজিত এই জনসভায় জামায়াত আমির স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণ আর কোনো দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, মামলাবাজ ও দখলদারদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি বিশেষ দলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা এতদিন মজলুম ছিলেন, তারা যেন ক্ষমতার গন্ধে জালিম হয়ে না ওঠেন।


জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান কোনো দলের নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের তীর ছিল স্পষ্টত বিএনপির দিকে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একসঙ্গে আন্দোলন করলেও সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আমরা বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করেছি—আপনারা মজলুম ছিলেন, জালিম হবেন না। মজলুমের কষ্ট তো বোঝার কথা। কিন্তু দেখা গেল, বেপরোয়া গতিতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মামলাবাজি শুরু হয়ে গেছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ৬ আগস্টের পর থেকে দেশের মানুষ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা ধূলিসাৎ করছে নব্য চাঁদাবাজ ও দখলদাররা। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে যে অপকর্মের মাধ্যমে জনগণকে কষ্ট দিয়েছে, একই ধরনের কর্মকাণ্ড ৬ আগস্টের পর থেকে নতুন করে শুরু হয়েছে। বড় বড় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে কোটি কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে।”

জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জোটসঙ্গী বা সমমনা দলগুলোর ভুলত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরে তিনি মূলত স্বচ্ছ ও নীতিবান রাজনীতির পক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা গত দেড় দশক দেশের মাটিতে ছিলেন না, পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন, ফিরে এসে তারাই এখন ‘মামলা বাণিজ্য’ করছেন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ফুটপাতে ভিক্ষা করা মানুষও আজ চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।


নির্বাচনী জনসভাকে কেন্দ্র করে ডিআইটি প্রজেক্ট খেলার মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে হাজারো জনতার উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, “এবারের নির্বাচনে জনগণ দুর্নীতিকে লাল কার্ড দেখাবে। চাঁদাবাজদের লাল কার্ড দেখাবে। মামলাবাজদের লাল কার্ড দেখাবে। দখলদারদের লাল কার্ড দেখাবে।”

তিনি ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলেন, জনগণ আর আধিপত্যবাদের দাসত্ব মেনে নেবে না। পুরনো শোষকদের হটিয়ে নতুন শোষকদের বসানোর জন্য জুলাই মাসে ছাত্র-জনতা রক্ত দেয়নি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমরা কি সন্তানদের বুকে নিয়ে জুলাই মাসে এ জন্য লড়াই করেছিলাম? পুরোনো চাঁদাবাজের বদলে নতুন চাঁদাবাজ তৈরি হবে—এ জন্য তো আন্দোলন হয়নি।”


ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী তরুণ ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলামের পক্ষে ভোট চেয়ে জামায়াত আমির বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা যুবকদের হাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব দিতে চাই। আমরা বেকার ভাতা দিতে চাই না। জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণেরা কখনো বেকার ভাতা চায়নি। তাদের দাবি ছিল, অধিকার ও ন্যায্য কাজের সুযোগ।”

তিনি উল্লেখ করেন, তরুণেরা রাস্তায় নেমে বলেছিল—‘আমাদের অধিকার দাও, আমাদের হাতে আমাদের ন্যায্য কাজ তুলে দাও।’ এই দাবি পূরণে তিনি নাহিদ ইসলামের মতো তরুণ ও মেধাবী নেতৃত্বকে সংসদে পাঠানোর আহ্বান জানান। তার মতে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর তরুণদের শক্তি ও সততার সংমিশ্রণেই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।


জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তার দলের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই)। সমাজের সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই ছিল তরুণদের আকাঙ্ক্ষা।

তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “নতুন বাংলাদেশে বিচার একেক জনের জন্য একেক রকম হবে না। সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে যেমন বিচার হবে, দেশের প্রধানমন্ত্রী একই অপরাধ করলে, তাঁকেও ছাড় দেওয়া হবে না।” আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান—এই নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।


দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসকারী ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন জামায়াত আমির। নির্বাচনে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “৫৯ জন ভয়াবহ ঋণখেলাপি ও ব্যাংক ডাকাতকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কেন? এদের এমপি বানিয়ে দুর্নীতি দমন হবে—এটা শুনলে হাসি পায়।”

তিনি বলেন, যারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরার কথা বলেন, তাদের আগে নিজেদের ঘর থেকে সেই টুঁটি চেপে ধরা শুরু করা প্রয়োজন। জামায়াত ও তাদের সমর্থিত জোট ক্ষমতায় গেলে বিদেশে পাচার হওয়া জনগণের প্রতিটি পয়সা ফেরত আনার জন্য সর্বাত্মক লড়াই চালানো হবে বলে তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেন।


জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। মামুনুল হক তার বক্তব্যে বলেন, ইসলাম ও মানবতার দুশমনদের রুখে দিতে হলে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে হবে। তিনি নাহিদ ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

এছাড়া জনসভায় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাহসের সঙ্গে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট পেপারে নিজেদের মতামত প্রকাশের আহ্বান জানান।

জনসভা শেষে এক বিশাল মিছিল মেরুল বাড্ডা ও এর আশপাশের এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মিছিল থেকে ‘দুর্নীতিবাজ হটাও, দেশ বাঁচাও’ এবং নাহিদ ইসলামের সমর্থনে নানা স্লোগান দেওয়া হয়। জামায়াত আমিরের আজকের এই বক্তব্য ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন