আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় সালথা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম। শনিবার রাতে সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি গ্রামে এক বিশাল নির্বাচনী উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও উন্নয়নের নানান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
নির্বাচনী ওই উঠান বৈঠকে শামা ওবায়েদ ইসলাম তার বক্তব্যে ধানের শীষ প্রতীকের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ধানের শীষ শুধু একটি নির্বাচনী প্রতীক নয়, এটি মূলত উন্নয়নের বার্তা বহন করে। আমরা যদি এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারি, তবে এই অবহেলিত জনপদের রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও হাসপাতালসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হবে।”
তিনি ভোটারদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে ধানের শীষের বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই। তবে দলের অভ্যন্তরে বা ভোটারদের মধ্যে কেউ যদি মুনাফেকি বা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে এই অঞ্চলের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে ধানের শীষে ভোট দেন এবং এলাকার ভাগ্য উন্নয়নে শরিক হন।
শামা ওবায়েদ তার রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে আবেগময় বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “আমার পরিবার ও আমি কখনও মিথ্যার সঙ্গে আপস করিনি। গত ১৭ বছর ধরে আমি আপনাদের পাশে আছি এবং কারও সঙ্গে মুনাফেকি করিনি। আপনারা যদি আমাকে দেশসেবার সুযোগ দেন, তবে সালথা ও নগরকান্দা উপজেলা জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের ভিত্তিতেই পরিচালিত হবে। এখানে কোনো একক আধিপত্য বা স্বৈরাচারী মনোভাব থাকবে না।”
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি ভোটারদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেন। শামা ওবায়েদ অভিযোগ করে বলেন, “একটি বিশেষ মহলের লোকজন আমাদের মা-বোনদের কাছে গিয়ে কৌশলে ভোটার আইডি কার্ড চাওয়ার চেষ্টা করছে। এটি নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ষড়যন্ত্রের অংশ।”
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কেউ যদি এ ধরনের কাজ করতে আসে বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, তবে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ বা সেনাবাহিনীকে জানাবেন। প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।” নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “ভোটের আর বেশি দিন বাকি নেই। আমি একা প্রার্থী নই, আপনারা প্রত্যেকেই একেকজন প্রার্থী। আপনারা প্রত্যেকে ‘রিংকু’ (শামা ওবায়েদের ডাকনাম) হয়ে ঘরে ঘরে ধানের শীষের বার্তা পৌঁছে দেবেন।”
তিনি আরও নির্দেশ দেন, “আগামী ১২ তারিখ সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোট দেওয়ার পর অন্য কাজ করবেন। কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যবস্থা আমরা করব এবং নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে দায়িত্ব নেবেন।”
এলাকার বেকার সমস্যা সমাধান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শামা ওবায়েদ শিল্পায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “ফরিদপুর অঞ্চল পাটের জন্য বিখ্যাত। এই সোনালী আঁশকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদিত পাটকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে কল-কারখানা স্থাপন করা হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হবে। এতে আমাদের ছেলে-মেয়েদের কাজের সন্ধানে আর ঢাকামুখী বা বিদেশমুখী হতে হবে না, তারা নিজ এলাকাতেই কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শামা ওবায়েদ সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আমরা একটি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সালথা-নগরকান্দা গড়তে চাই। দলমত নির্বিশেষে কেউ যদি দুর্নীতি, দখলবাজি বা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়, তবে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে কেউ পার পাবে না।”
গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি গ্রামে নুরুউদ্দিন মাতুব্বরের বাড়িতে আয়োজিত এই উঠান বৈঠকটি স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শামসুদ্দিনের সঞ্চালনায় এবং গট্টি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান ইউপি সদস্য নুরুউদ্দিন মাতুব্বরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি এক জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
এ সময় মঞ্চে বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, সালথা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. আছাদ মাতুব্বর, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক খায়রুল বাশার আজাদ এবং প্রবীণ বিএনপি নেতা ইমামুল হোসেন তারা মিয়া।
এছাড়াও সালথা উপজেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন, গট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লাভলু, সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল রহমান চয়ন, যুবদল নেতা এনায়েত হোসেন এবং আব্দুর রব মাতুব্বরসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনী এই উঠান বৈঠক শেষে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় এবং শামা ওবায়েদ সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করেন।
