বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারে আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম আজ শুরু হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এই বিচারকার্য পরিচালিত হবে। আজ প্রথম দিনেই জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হতে পারেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ১০৪ জনকে গুম করে হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত জিয়াউলের বিচারের এই ধাপটি ভুক্তভোগী পরিবার এবং দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই সাক্ষ্যগ্রহণ করবেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দিনের শুরুতেই রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন টিমের পক্ষ থেকে মামলার প্রেক্ষাপট এবং জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরে সূচনা বক্তব্য (Opening Statement) প্রদান করা হবে। প্রসিকিউশনের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই মামলার এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি গ্রহণের মধ্য দিয়ে মূল বিচারিক প্রক্রিয়া বা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হবে। একজন সাবেক সেনাপ্রধানের অন্য একজন সাবেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য প্রদান দেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
অভিযোগের ভয়াবহতা: ১০৪ জনকে হত্যা ও গুম
গত ১৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার শুরুর আদেশ দেন। প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া অভিযোগনামায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সব তথ্য উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে মূলত তিনটি ঘটনায় মোট ১০৪ জনকে গুম ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
১. গাজীপুরের পুবাইল হত্যাকাণ্ড (২০১১): জিয়াউলের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগটি ২০১১ সালের ১১ জুলাই সংঘটিত ঘটনার। অভিযোগ রয়েছে, ওই দিন রাতে গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতি ও নির্দেশনায় সজল নামের এক ব্যক্তিসহ মোট চারজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
২. পাথরঘাটার বধ্যভূমি (২০১০–২০১৩): দ্বিতীয় অভিযোগটি আরও বেশি লোমহর্ষক। ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে হত্যার দায় চাপানো হয়েছে তার ওপর। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ব্যক্তিকে গুম করার পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো বা গহীন অরণ্যে ফেলে দেওয়া হতো।
৩. তৃতীয় অভিযোগ: প্রসিকিউশনের তৃতীয় অভিযোগটিও দ্বিতীয়টির মতোই ভয়াবহ, যেখানে একই কায়দায় আরও ৫০ জনকে গুম ও হত্যার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১০৪ জন মানুষের প্রাণহানি ও গুমের সঙ্গে জিয়াউল আহসানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে জিয়াউল আহসান ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং পরবর্তীতে এনটিএমসি-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিরোধী মত দমন, ফোনে আড়িপাতা, ডিজিটাল নজরদারি এবং তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালা তৈরির কারিগর হিসেবে তার নাম বারবার উঠে এসেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল যে, জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ বাহিনী দেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এনটিএমসি-এর প্রধান হিসেবে তিনি দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে নজরদারি চালাতেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আজ তার বিচারের মুখোমুখি হওয়াকে অনেকেই ‘ন্যায়বিচারের বিজয়’ হিসেবে দেখছেন।
মামলার এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নাম থাকাটা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। ইকবাল করিম ভূঁইয়া ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ধারণা করা হচ্ছে, তার সাক্ষ্যে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে গিয়ে জিয়াউল আহসান কীভাবে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্রয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিলেন এবং কীভাবে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করেছিলেন, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে। তার জবানবন্দি এই মামলার আইনি ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এর আগে জানিয়েছিলেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা ব্যাপক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি, ডিজিটাল এভিডেন্স এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জিয়াউলের সম্পৃক্ততা পরিষ্কার। প্রসিকিউশন টিম জানিয়েছে, তারা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।
আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণের দিকে তাকিয়ে আছে গুম হয়ে যাওয়া মানুষের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ সহ হাজারো ভুক্তভোগী পরিবার। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যারা তাদের প্রিয়জনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন, তাদের কাছে আজকের দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার এক বড় সুযোগ।
আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জিয়াউল আহসানকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। তার উপস্থিতিতেই সাক্ষ্যগ্রহণ চলবে।
