ভূ-রাজনীতির দাবা খেলায় আবারও নাটকীয় মোড়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার তথাকথিত ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলা টানাপড়েনের অবসান ঘটল এক ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক সমঝোতার মাধ্যমে। দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় ভারতের ওপর যে চড়া শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, তা অবশেষে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই ছাড়ের বিনিময়ে ভারতকে দিতে হয়েছে এক কঠিন প্রতিদান—রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে ভারতের ওপর থেকে পূর্বে আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১ মিনিট (ইস্টার্ন টাইম) থেকে এই আদেশ কার্যকর হবে বলে হোয়াইট হাউজ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এবং কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই শুল্ক প্রত্যাহারের ঘটনাটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক ছাড় নয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ সস্তা জ্বালানি তেল আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটন এই বিষয়ে দিল্লির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। অবশেষে সেই চাপে নতি স্বীকার করে দিল্লি এখন থেকে রাশিয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জ্বালানি পণ্য ক্রয় করবে বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে—বিশেষ করে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে—একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে ঘোষিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করার লক্ষ্যেই শুক্রবারের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নির্বাহী আদেশের ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা, বিশেষ করে টেক্সটাইল, ওষুধ এবং ইস্পাত শিল্পের ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের স্বস্তি পাবেন।
চুক্তির উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
১. শুল্ক হ্রাস: ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
২. পাল্টা শুল্ক কমানো: এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ভারত যে পাল্টা শুল্ক বসিয়েছিল, নতুন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতীয় পণ্যের ওপর তাদের সাধারণ শুল্কের হারও ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনবে। তবে এই প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
৩. জ্বালানি আমদানির উৎস পরিবর্তন: ভারত তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG) এবং ক্রুড অয়েল দিয়ে পূরণ করবে।
৪. প্রতিরক্ষা রূপরেখা: শুধু বাণিজ্য নয়, আগামী ১০ বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরিতেও ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার ওপর ভারতের সামরিক নির্ভরতা আরও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সখ্যতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ‘হাউডি মোদি’ বা ‘নমস্তে ট্রাম্প’ ইভেন্টগুলো তাদের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর, তিনি ভারতের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির কঠোর সমালোচনা করেন এবং ভারতকে ‘ট্যারিফ কিং’ বা শুল্কের রাজা বলে অভিহিত করেন। এর জেরে তিনি ভারতীয় পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করেন, যা দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরায়।
তবে শুক্রবারের এই আদেশের মাধ্যমে সেই ফাটল জোড়া লাগল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের এই নতুন পদক্ষেপ ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করল। ট্রাম্প আবারও মোদিকে তার ‘অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এই চুক্তিকে ‘উভয় দেশের জন্য বিশাল বিজয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তি ভারতের অর্থনীতির জন্য একটি মিশ্র বার্তা বয়ে এনেছে। একদিকে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কের প্রবেশাধিকার রপ্তানি আয় বাড়াতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে সস্তা তেল আমদানি বন্ধ হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানি করা রাশিয়ার তুলনায় ব্যয়বহুল হতে পারে, যা ভারতের মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আশা করছে, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর ভারতের জন্য লাভজনক হবে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ভারতের সামরিক আধুনিকায়নে গতি আনবে।
২০২৬ সালের শুরুতে এসে এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের একটি বড় ইঙ্গিত। চীনকে মোকাবিলা এবং রাশিয়াকে একঘরে করার মার্কিন নীতিতে ভারতকে পুরোপুরি পাশে পাওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক ও সামরিক—উভয় হাতিয়ারই ব্যবহার করেছে। ভারত এতদিন ‘কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য’ বজায় রেখে চললেও, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই বেশি ঝুঁকতে বাধ্য হলো।
শনিবার থেকে কার্যকর হওয়া এই শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। এখন দেখার বিষয়, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে ভারত তার পুরনো মিত্র মস্কোর সাথে সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখে এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজার কীভাবে সামাল দেয়।
