জামায়াতের জনসভায় ‘জয়বাংলা’ স্লোগান, এবি পার্টির নেতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু রাজনীতির মাঠে যে শেষ কথা বলে কিছু নেই, তারই এক বিস্ময়কর নজির দেখা গেল পটুয়াখালীর বাউফলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর এক বিশাল নির্বাচনি জনসমাবেশে মঞ্চ কাঁপালেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে। তাও আবার এমন একজন নেতার মুখে, যিনি ১১ দলীয় জোটের শরিক এবি পার্টির (আমার বাংলাদেশ পার্টি) নেতা।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সমর্থনে আয়োজিত জনসভায় এই অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটে। বাউফল পৌর শহরের পাবলিক মাঠে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খোদ জামায়াতে ইসলামীর আমু ডা. শফিকুর রহমান। তার উপস্থিতিতেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও এবি পার্টির নেতা অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন। মুহূর্তের মধ্যে এই ঘটনাটি কেবল সভাস্থলে নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছে।


শুক্রবার দুপুরের পর থেকেই বাউফল পাবলিক মাঠে ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সমর্থনে হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হতে থাকেন। সমাবেশটি মূলত ১১ দলীয় জোটের শক্তির মহড়া হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জোটের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা। সভার এক পর্যায়ে বক্তব্য রাখতে ওঠেন অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন। তিনি আসন্ন নির্বাচনে এই আসনে ‘ঈগল’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও, জোটের স্বার্থে ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পক্ষে কাজ করার এবং তাকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন।

নিজের বক্তব্যের পুরো সময়জুড়ে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সুশাসন এবং জোটের বিজয়ের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু বক্তব্যের একদম শেষ পর্যায়ে এসে তিনি সবাইকে চমকে দেন। প্রথাগতভাবে ইসলামী দলগুলোর সমাবেশে ‘আল্লাহ হাফেজ’ বা ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বক্তব্য শেষ করার রীতি থাকলেও, অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেন, “জয় বাংলা, আসসালামু আলাইকুম।”

মাইকে এই স্লোগান উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত জনসমাবেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাতে থাকেন। মঞ্চে থাকা জামায়াত ও জোটের অন্য নেতাদের মধ্যেও কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিবাদ জানাননি।


স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, জামায়াতে ইসলামীর মতো দলের জনসভায় দাঁড়িয়ে তাদের ঘোর আদর্শিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবে পরিচিত ‘জয় বাংলা’ কেন উচ্চারণ করলেন এই নেতা? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা ও বিশ্লেষণ।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি এটিকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ এবং ‘সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার মাধ্যম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইটিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে কৌশল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাউফলের গ্রাম পর্যায়ে এখনো আওয়ামী লীগের একটি বিশাল ভোটব্যাংক বা রিজার্ভ ভোট রয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভ্যাসের কারণে তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটির সাথে মানসিকভাবে যুক্ত। আমি তাদের এই বার্তা দিতে চেয়েছি যে, আমরা তাদের শত্রু নই।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী বা সমর্থক অপরাধী নন। হাতেগোনা কিছু নেতা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসের সাথে জড়িত থাকতে পারেন, কিন্তু সাধারণ যে কৃষক বা শ্রমিক এতদিন নৌকায় ভোট দিয়েছেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি। তার ভোটটি আমাদের প্রয়োজন। তাদের সমর্থন পেতেই আমি সচেতনভাবে এই স্লোগান ব্যবহার করেছি। অপরাধে জড়িত মানুষের সংখ্যা খুবই সামান্য, কিন্তু সাধারণ ভোটার অনেক বেশি।”


অ্যাডভোকেট রুহুল আমিনের এই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গীরা কেবল নিজেদের ‘কোর ভোট’ বা নিজস্ব ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। বরং তারা আওয়ামী লীগের হতাশ ও নেতৃত্বশূন্য কর্মী-সমর্থকদের ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে মরিয়া।

‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ হলেও গত কয়েক দশকে এটি আওয়ামী লীগের দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। এবি পার্টি বা আমার বাংলাদেশ পার্টি গঠিত হওয়ার পর থেকেই তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে ইসলামী মূল্যবোধের একটি সংমিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করছে। রুহুল আমিনের এই স্লোগান সেই রাজনৈতিক দর্শনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

তবে জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূলের অনেক কর্মী বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর নিচে মন্তব্যের ঘরে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যেই দলের হাতে তাদের নেতাকর্মীরা নির্যাতিত হয়েছেন, সেই দলের স্লোগান তাদের মঞ্চে দেওয়া আদর্শিক দেউলিয়াত্ব। অন্যদিকে, উদারপন্থী নেটিজেনরা বিষয়টিকে রাজনীতির ‘ইতিবাচক পরিবর্তন’ বা ‘সহনশীলতা’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন।


স্লোগান বিতর্কের বাইরেও নিজের বক্তব্যে অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আগামীতে ১১ দলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় গেলে দেশে কোনো লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অন্যায়ের রাজনীতি থাকবে না। আমরা এমন একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে থাকবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাউফলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নামে লুটপাটের শিকার হয়েছে। ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ নির্বাচিত হলে এই জনপদকে সন্ত্রাসমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী একটি মডেল উপজেলায় রূপান্তর করা হবে।


পটুয়াখালী-২ আসনে ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমনিতেই শক্তিশালী প্রার্থী। তার ওপর অ্যাডভোকেট রুহুল আমিনের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থন তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। তবে এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান সাধারণ ভোটারদের মনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, নাকি জোটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন কোনো ফাটল ধরাবে—তা দেখার জন্য নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, বাউফলের এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও কৌতুহলোদ্দীপক অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন