কালো টাকায় কাজ না হওয়ায় জেল থেকে সন্ত্রাসীদের নামানো হচ্ছে: “গোলাম পরওয়ার”

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চরম উত্তপ্ত। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বাড়ছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বাকযুদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায় আজ শনিবার এক গুরুতর ও বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল এবং এই আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেছেন, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা কালো টাকার পাহাড় ঢিলেও ভোটারদের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন তারা পরাজয়ের ভয়ে ভীত হয়ে ভিন্ন ও বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছে। তার অভিযোগ, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে কারাগার থেকে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্ত করে আনা হচ্ছে।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, হাট-বাজার এবং প্রত্যন্ত গ্রামে ব্যাপক গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠককালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থক তার সাথে ছিলেন।


মিয়া গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা অবৈধ অর্থের দাপট দেখিয়ে আসছেন। কিন্তু খুলনার সচেতন জনতা টাকার বিনিময়ে তাদের পবিত্র আমানত বা ভোটাধিকার বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কালো টাকার প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হয়ে এখন তারা পেশিশক্তির আশ্রয় নিচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাচ্ছি, এলাকার চিহ্নিত দাগি আসামি এবং সন্ত্রাসীদের তড়িঘড়ি করে জেল থেকে বের করে আনা হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার—ভোটের দিন কেন্দ্র দখল করা এবং সাধারণ ভোটারদের নির্দিষ্ট একটি প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা। এটি কেবল নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়, বরং গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল।”

তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসীরা এলাকায় মহড়া দিলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে সাহস পাবেন না। আর এই সুযোগটিই নিতে চাইছে একটি বিশেষ মহল। তারা জানে, সুষ্ঠু ভোট হলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।


নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার ওপর জোর দেন। তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, কোনো দলের বা ব্যক্তির আজ্ঞাবহ নন। আপনাদের দায়িত্ব হলো প্রতিটি ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারা জেল থেকে বের হচ্ছে এবং এলাকায় কী ধরনের গোপন বৈঠক করছে, সেদিকে আপনাদের কড়া নজরদারি থাকতে হবে।”

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি প্রশাসনের চোখের সামনে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মহড়া দেয় এবং প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে উদ্ভুত পরিস্থিতির দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে। অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বহিরাগত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানান তিনি।


নির্বাচনী ব্যস্ততার মধ্যেও জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা। সম্প্রতি ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চ এবং সরকারি কর্মচারীদের চলমান দাবি আদায়ের আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ ও হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে কেউ তার যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে পারে। সরকারি কর্মচারীরা বা ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা যে দাবিগুলো তুলে ধরেছেন, তা আলোচনার টেবিলে সমাধান করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সরকার আলোচনার পথে না হেঁটে দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা পুলিশের এই নগ্ন হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

তবে আন্দোলনের সময়কাল বা ‘টাইমিং’ নিয়ে তিনি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনাদের দাবির প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে যখন পুরো জাতি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন রাজপথ অচল করে দেওয়া কোনো শুভলক্ষণ নয়। এতে তৃতীয় কোনো পক্ষ ফায়দা লুটতে পারে। তাই নির্বাচনের পর এসব দাবি নিয়ে আন্দোলন করা আরও বেশি ফলপ্রসূ হতে পারত।”


ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনটি ঐতিহাসিকভাবেই জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মিয়া গোলাম পরওয়ার এর আগেও এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শনিবারের গণসংযোগে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক এবং তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

স্থানীয় ভোটারদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, এলাকায় সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তারা একজন সৎ ও যোগ্য প্রতিনিধি চান। গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে ডুমুরিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি ও মৎস্য খাতের উন্নয়ন এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন।


নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, খুলনা-৫ আসনে টানটান উত্তেজনা ততই বাড়ছে। একদিকে জামায়াত প্রার্থীর সন্ত্রাসীদের মাঠে নামানোর অভিযোগ, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের পাল্টা কৌশল—সব মিলিয়ে ভোটের মাঠ এখন সরগরম। মিয়া গোলাম পরওয়ারের এই অভিযোগ নির্বাচন কমিশন কতটা আমলে নেয় এবং ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে সাধারণ ভোটাররা চান, সব শঙ্কা কাটিয়ে তারা যেন নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন