চীনের গোপনপারমাণবিক পরীক্ষার বিস্ফোরকে, চরম উত্তেজনয় যুক্তরাষ্ট্রের

বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার একমাত্র অবশিষ্ট পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। জেনিভায় চলমান বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালে গোপনে পারমাণবিক পরীক্ষার গুরুতর অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, বেইজিং আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়িয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে এই পরীক্ষা চালিয়েছে। এই অভিযোগ এবং পাল্টা জবাবের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম বিশ্বের প্রধান দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ—যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তাদের অস্ত্রের ভাণ্ডার বাড়ানোর সুযোগ পেল। এই সংবেদনশীল সময়ে চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।


জেনিভা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস ডিন্যানো চীনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যে, চীন ২০২০ সালে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে।

ডিন্যানো সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করে বলেন, “২০২০ সালের ২২ জুন চীন এমন একটি পরীক্ষা চালায়, যা সাধারণ সিসমিক মনিটরিং বা ভূ-কম্পন মাপক যন্ত্রে ধরা পড়ার কথা ছিল না। তারা ‘ডিকাপলিং’ (Decoupling) নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ‘ডিকাপলিং’ হলো এমন একটি কৌশল যেখানে মাটির গভীরে বিশাল গুহা বা গহ্বরে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যাতে বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট কম্পন বা শকওয়েভ মাটির সাথে মিশে যায় এবং বাইরের মনিটরিং স্টেশনে ধরা না পড়ে। ডিন্যানোর মতে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) খুব ভালোভাবেই জানত যে এই পরীক্ষাগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চরম লঙ্ঘন। তাই তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং পরিকল্পিতভাবে এই কার্যক্রম আড়াল করার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আরও অভিযোগ করেছে যে, চীন শত শত টন বিস্ফোরণ ক্ষমতার প্রস্তুতি নিয়েছিল, যা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।


সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলে, চীন বর্তমানে যে গতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, তা শঙ্কার কারণ। পেন্টাগনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বেইজিং তাদের পারমাণবিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দ্রুতগতিতে নতুন নতুন সাইলো বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে যাবে। এটি কেবল এশিয়ার আঞ্চলিক ভারসাম্যই নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।


যুক্তরাষ্ট্রের এই গুরুতর অভিযোগের জবাবে চীনের নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক রাষ্ট্রদূত শেন জিয়ান সম্মেলনে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগগুলোকে সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার না করে কৌশলী অবস্থান নেন। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে ‘মিথ্যাচার’ এবং ‘বাড়িয়ে বলা’ (Exaggeration) হিসেবে অভিহিত করেন।

শেন জিয়ান বলেন, “চীন সবসময় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংযত, বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল আচরণ করে আসছে। আমাদের নীতি হলো ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে ব্যবহার না করা। অথচ যুক্তরাষ্ট্র অনবরত ‘চীন ভীতি’ ছড়িয়ে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার বড় করার পাঁয়তারা করছে।”

তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো নতুন ত্রিপক্ষীয় পারমাণবিক আলোচনায় বসতে রাজি নয়। চীনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ভাণ্ডার চীনের তুলনায় বহুগুণ বড়, তাই সমতার ভিত্তিতে আলোচনা না হলে চীন তাতে অংশ নেবে না। শেন জিয়ান ওয়াশিংটনকে ‘স্নায়ুযুদ্ধ যুগের মানসিকতা’ ত্যাগ করে গঠনমূলক আলোচনায় আসার আহ্বান জানান।


২০১০ সালে বারাক ওবামা এবং দিমিত্রি মেদভেদেভ স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিটি এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১৫৫০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন আর কোনো আইনি বাধা রইল না।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক অনলাইন পোস্টে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “রাশিয়া ও চীন যদি মনে করে তারা কোনো বাধা ছাড়াই তাদের পারমাণবিক মজুত বাড়াতে থাকবে, তবে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরাও আমাদের অস্ত্রাগার আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করব।”

রুবিও’র এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কেবল রাশিয়ার সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে বিশ্বাসী নয়। তারা মনে করে, ২০২৬ সালে এসে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো বদলে গেছে। এখন চীন একটি বড় ফ্যাক্টর। তাই যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায় যেখানে চীনকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে। কিন্তু চীন সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে নারাজ।


নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির অবসান এবং চীনের গোপন পরীক্ষার অভিযোগ—এই দুই ঘটনা মিলে বিশ্বকে একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার (Arms Race) দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতদিন যে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় ছিল, তা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। যদি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন—এই তিন পরাশক্তি পাল্লা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি শুরু করে, তবে তা মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জেনিভা সম্মেলনের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় সেই অনাগত সংকটেরই পূর্বাভাস দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন