দীর্ঘ প্রায় এক মাস মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানল টেকনাফের ছোট্ট শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনান। মিয়ানমার সীমান্ত থেকে উড়ে আসা তপ্ত বুলেটে বিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হুজাইফা আজ শনিবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
হুজাইফার মৃত্যুতে টেকনাফের সীমান্ত জনপদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একইসঙ্গে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গোলাগুলি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তার মামা মাহফুজুর রহমান। তিনি জানান, চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হুজাইফাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
গেল ১১ জানুয়ারি, শনিবার। অন্যান্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সকালটা। কিন্তু টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্তের বাসিন্দাদের জন্য দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। সকালের দিকে হঠাৎ করেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আসা গুলিতে বিদ্ধ হয় শিশু হুজাইফা। সে সময় সে নিজ বাড়ির আঙিনায় বা তার আশেপাশেই অবস্থান করছিল। আচমকা একটি গুলি এসে তার গায়ে বিদ্ধ হলে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার অবস্থার অবনতি ঘটলে দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) পাঠানো হয়। সেখানেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় এবং আঘাত গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ ২৭ দিন আইসিইউ এবং বিশেষ পর্যবেক্ষণে থাকার পর আজ সকালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমাল নিষ্পাপ এই শিশুটি।
হুজাইফার মৃত্যুসংবাদ টেকনাফে পৌঁছানোর পর তার বাড়িতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন—অন্য দেশের যুদ্ধের বলি কেন হতে হলো তাদের আদরের সন্তানকে? নিজ বাড়িতে থেকেও যদি জীবনের নিরাপত্তা না থাকে, তবে তারা কোথায় যাবে?
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক মাস ধরেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। হুজাইফার মৃত্যু তাদের সেই ভয়কে বাস্তবে রূপ দিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সরকারের কাছে সীমান্ত এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
হুজাইফার এই করুণ পরিণতির মূল কারণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান তুমুল গৃহযুদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে টেকনাফ সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপ এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে যুদ্ধের ভয়াবহতা বেড়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:
১. বিমান হামলা ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার: জান্তা বাহিনী তাদের অবস্থান ধরে রাখতে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির লক্ষ্যবস্তুতে নিয়মিত বিমান হামলা চালাচ্ছে। ড্রোন হামলা, মর্টার শেল নিক্ষেপ এবং শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফ, সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দাদের নির্ঘুম রাত কাটছে।
২. গোলাগুলির প্রভাব: যুদ্ধের তীব্রতায় লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি ও মর্টার শেলের অংশবিশেষ প্রায়ই বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পড়ছে। হুজাইফার ঘটনাটি তারই এক নির্মম উদাহরণ। এর আগেও একাধিকবার বাংলাদেশি ঘরবাড়িতে গুলি এসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
৩. মংডু দখলের লড়াই: আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিলেও মংডু টাউনশিপ এখনও পুরোপুরি দখলে নিতে পারেনি। ফলে সেখানে জান্তা বাহিনীর সাথে তাদের মরণপণ লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে নাফ নদীর এপারে বাংলাদেশের জনবসতিতে।
সীমান্তের এই অস্থির পরিস্থিতিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করার পাশাপাশি যেকোনো অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে ভারী অস্ত্রের গোলার আওয়াজ এবং মাঝে মাঝে উড়ে আসা বুলেটের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকরা ভয়ে সীমান্তসংলগ্ন জমিতে চাষাবাদ করতে যেতে পারছেন না, জেলেরাও নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আতঙ্কে থাকছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন আর কেবল তাদের দেশের বিষয় নেই, এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হুজাইফার মতো একটি শিশুর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, সীমান্ত এলাকাগুলোতে বেসামরিক নাগরিকদের ঝুঁকি কতটা প্রবল। তারা মনে করেন, কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এমন মর্মান্তিক ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে।
হুজাইফা সুলতানা আফনান চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল এক অমীমাংসিত প্রশ্ন ও এক ভয়ার্ত জনপদ। তার জানাজার নামাজ ও দাফন সম্পন্ন করার জন্য মরদেহ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
