দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে যেন আগুনের ছোঁয়া লেগেছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবী স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বাড়ার কারণে আবারও রেকর্ড গড়েছে মূল্যবান এই ধাতুটির দাম। স্বর্ণের এই আকাশচুম্বী দামে সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। আজ রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬), সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের বাজারে স্বর্ণ ও রুপা কেনাবেচা হচ্ছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) কর্তৃক নির্ধারিত সর্বশেষ দরে।
সবশেষ গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, যা ওইদিন সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এক লাফে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বাজুসের নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ রবিবার দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে সোমবারের নির্ধারিত দরেই। ক্রেতাদের সুবিধার্থে বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের বিস্তারিত দাম নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ২২ ক্যারেট (সবচেয়ে ভালো মান): প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকায়। সাধারণত গহনা তৈরির জন্য এই মানের স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এবং এর চাহিদাও সর্বাধিক।
২. ২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৩ টাকা। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এই মানের স্বর্ণের চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
৩. ১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৮ টাকায়। আধুনিক ও হালকা ডিজাইনের গহনা তৈরিতে ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণের ব্যবহার বাড়ছে।
৪. সনাতন পদ্ধতি: পুরনো বা সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৫ টাকা।
বাজুস নির্ধারিত ওপরে উল্লিখিত দামগুলো হলো কেবল স্বর্ণের বার বা কাঁচামালের দাম। সাধারণ ক্রেতারা যখন জুয়েলারি দোকান থেকে গহনা কিনবেন, তখন এই দামের সঙ্গে আরও কিছু খরচ যুক্ত হবে। বাজুসের নিয়ম অনুযায়ী, স্বর্ণের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট (VAT) যুক্ত করতে হবে। এছাড়া, গহনা তৈরির মজুরি বা মেকিং চার্জ হিসেবে বাজুস-নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি আজ ২২ ক্যারেটের এক ভরি ওজনের একটি গহনা কিনতে চান, তবে তাকে মূল দাম ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকার সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ প্রায় ১৩,০৫২ টাকা এবং ৬ শতাংশ মজুরি বাবদ প্রায় ১৫,৬৬২ টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে। অর্থাৎ, এক ভরি গহনা কিনতে ক্রেতার মোট খরচ পড়বে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাছাকাছি। অবশ্য গহনার ডিজাইনের জটিলতা ও মানভেদে মজুরির এই হার আরও বাড়তে পারে।
স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও রুপার বাজার কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। আজ রবিবার দেশের বাজারে রুপার দামে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও তা সাধারণের নাগালের মধ্যে রয়েছে বলা কঠিন। বর্তমানে বাজারে রুপার ক্যাটাগরি অনুযায়ী দামগুলো নিম্নরূপ:
- ২২ ক্যারেট: প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৩৫৭ টাকায়।
- ২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি রুপার দাম ৬ হাজার ৬৫ টাকা।
- ১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ১৯০ টাকায়।
- সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৯০৭ টাকা।
চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত রুপার বাজারেও বেশ অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। বছরের প্রথম দেড় মাসেই রুপার দাম মোট ১৭ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ৭ বার কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে রুপার দাম মোট ১৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১০ বার বৃদ্ধি এবং ৩ বার হ্রাস পেয়েছিল।
স্বর্ণের বাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালটি স্বর্ণের বাজারের জন্য অত্যন্ত অস্থির একটি বছর হিসেবে শুরু হয়েছে। বছরের মাত্র দেড় মাস অতিক্রান্ত হয়েছে (১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত), এরই মধ্যে বাজুসকে ২৮ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে, আর কমানো হয়েছে মাত্র ১০ বার। এত অল্প সময়ে এত ঘন ঘন দাম পরিবর্তন বাজারের অস্থিতিশীলতারই প্রমাণ দেয়।
তুলনামূলকভাবে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পুরো বছরে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং ২৯ বার কমানো হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, স্বর্ণের দাম কমার চেয়ে বাড়ার প্রবণতাই বেশি এবং তা ক্রমশ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবী স্বর্ণ’ বা পিওর গোল্ডের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম, তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর স্বর্ণের দাম নির্ভর করে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে পুরনো স্বর্ণের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আমদানিনির্ভরতার কারণেও দামে প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণকে বেছে নিচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও।
বাজুসের পক্ষ থেকে ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গহনা কেনার সময় অবশ্যই হলমার্ক যাচাই করে এবং সঠিক মেমো বা রসিদ সংগ্রহ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে এত উচ্চমূল্যে স্বর্ণ কেনার সময় ক্যারেট ও ওজন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বাজুসের অনুমোদিত ডিলার বা জুয়েলার্স থেকে গহনা কেনা নিরাপদ। পরিশেষে বলা যায়, আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার স্বর্ণ ও রুপার বাজারদর অপরিবর্তিত থাকলেও, বর্তমান মূল্যস্তর ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। যারা বিয়ে বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য গহনা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের বাজেট নতুন করে হিসাব করতে হবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সহসাই স্বর্ণের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এটি আরও বাড়তে পারে।
