জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপ শেষে এখন সময় হিসাব-নিকাশের। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে এবং দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন সমীকরণের জন্ম হয়েছে। সরকার গঠন না করলেও এবারের সংসদে একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে। ভোটের লড়াই শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সংসদে তাদের ভূমিকা এবং জুলাইয়ের চেতনার বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘সময় সংবাদ’-কে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তার দল সংসদে কোনো ‘পুতুল বিরোধী দল’ হবে না, বরং জনগণের অধিকার আদায়ে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে একটি কার্যকর বিরোধী দলের কোনো বিকল্প নেই। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জামায়াত এবার সংসদে জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন, “আমাদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা এবার অন্তত নেই, সেটা ফলাফল দেখেই সবাই বুঝতে পারছি। কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা মনে করি, জনগণ আমাদের যেটুকু সমর্থন দিয়েছে, যে কয়টি আসন আমরা পেয়েছি, তা দিয়েই আমরা দেশের সেবা করতে পারব এবং সংসদে একটি ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করতে পারব।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, সরকারের অন্ধ বিরোধিতা তাদের লক্ষ্য নয়। সরকারের নেয়া যেকোনো জনকল্যাণমূলক এবং দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগে জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দেবে। তবে যদি দেশ এবং জনগণের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, তবে তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না। ডা. শফিকুর রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “দেশের স্বার্থে সরকার কোনো ভালো উদ্যোগ নিলে আমরা অবশ্যই সমর্থন দেব। কিন্তু আবার যদি দেখি দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে, তাহলে আমরা কোনো ধরনের চাটুকারিতা করব না। আমরা সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস নিয়ে সংসদে কথা বলব।”
জুলাই বিপ্লব বা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখা জামায়াতের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা বলে উল্লেখ করেন দলটির আমির। ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন সমাজ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাইয়ের চেতনা কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র সংস্কারের মূল ভিত্তি। সংসদে আমাদের অবস্থান হবে সেই চেতনার পক্ষে। নাগরিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমাদের দল অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।”
নির্বাচনী ফলাফলের পর দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতার মসনদে না বসলেও জনগণের সেবা করা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, সংসদে বিরোধী দলের আসনে থেকেও স্থানীয় উন্নয়ন এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা যায়। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশবাসীর প্রতি আমাদের বিশাল দায়বদ্ধতা রয়েছে। হয়তো সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অনেক কিছু আমাদের হাতে থাকবে না, যা সরকারে থাকলে থাকত। কিন্তু এরপরও জনগণের জন্য কাজ করার অফুরন্ত সুযোগ আমাদের থাকবে। আমরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাই।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের দলের নীতি পরিষ্কার—আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার জনগণ, দুই নম্বর অগ্রাধিকার জনগণ এবং তিন নম্বর অগ্রাধিকারও থাকবে জনগণ। জনগণকে কেন্দ্র করেই আমাদের সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমপিদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ একটি আলোচিত বিষয়। এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, সংসদে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রাপ্য ন্যায্য সুবিধার বাইরে অতিরিক্ত কোনো সুযোগ-সুবিধা বা বিলাসিতা গ্রহণ করবে না তার দল। বরং, স্থানীয় জনগণের পাশে থেকে এলাকার উন্নয়নে নিজেদের উজাড় করে দেবেন। তিনি বলেন, “আমরা রাজনীতি করি জনগণের জন্য, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নয়। তাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের অপচয় রোধে আমরা সচেষ্ট থাকব।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে প্রতিহিংসার এক ভয়াবহ সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায়। তবে ডা. শফিকুর রহমান এই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে চান। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেন, “যেকোনো ধরনের প্রতিহিংসা বর্জন করে দেশের সব নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে জামায়াত ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কেউ নির্যাতিত হবে না।”
তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা নির্বাচনের আগেই বলেছিলাম, এমন কোনো বক্তব্য দেব না যা আমরা মানতে পারব না বা মানব না। আমরা যা বলেছি, ইনশাআল্লাহ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। ভালো কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, আর মন্দ কাজে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। তবে সেই প্রতিবাদ হবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ।”
ডা. শফিকুর রহমানের এই সাক্ষাৎকার থেকে স্পষ্ট যে, জামায়াতে ইসলামী এবার সংসদে একটি কৌশলী এবং পরিপক্ক রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। তারা একদিকে যেমন সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবে, অন্যদিকে রাজপথের আন্দোলনের চেয়ে সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায়ে বেশি মনোযোগী হবে। জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ করে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে তারা কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বিরোধী দল হিসেবে তাদের এই ‘জনগণকেন্দ্রিক’ ও ‘প্রতিহিংসামুক্ত’ রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেশের সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে।
