নির্বাচনী উত্তাপের শেষ মুহূর্তে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ঘটনা। ঋণখেলাপির দায়ে নিজের প্রার্থিতা হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী শেষ পর্যন্ত ভোটারদের হুমকি দিয়ে বসলেন। প্রকাশ্য জনসভায় তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্য করে বলেন, নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট না দিলে তাদের ‘ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার’ করে দেওয়া হবে। তার এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার রাতে তাকে বিএনপি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এমন ঘটনায় দেবিদ্বারের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
গত সোমবার রাতে দেবিদ্বার উপজেলার গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাকসার গ্রামে একটি উঠান বৈঠকে অংশ নেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। ঋণখেলাপির কারণে নিজের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় তিনি এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিনের ‘ট্রাক’ প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী উপস্থিত ভোটারদের উদ্দেশে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “যদি ক্ষমতায় বিএনপি থাকে, আর যদি আপনারা অন্য দলকে ভোট দেন, আমি কিন্তু আপনাদের কাউকে ছাড়ব না। প্রয়োজনে তাদের ঘরবাড়ি পোড়াইয়া সব ছারখার করে দেব।”
তিনি এখানেই থামেননি। নিজের ক্ষমতার দাপট দেখাতে তিনি আরও বলেন, “আমি কিন্তু কথাটা খুব পরিষ্কারভাবে বলতাছি। এটা মনে কইরেন না আমি ভয় দেখাচ্ছি। আমি পরিষ্কার করে বলতেছি, এটা পারলে রেকর্ড করে ফেসবুকে ছাইড়া দিতে পারেন, আমার কোনো অসুবিধা নেই।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি ব্যক্তিগত অপমানের প্রসঙ্গ টেনে ভোটারদের আবেগের জায়গায় আঘাত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমাকে যেন অপমানিত না হতে হয়। আমি যদি অপমানিত হই, সেই অপমানের শোধ আমি ওইভাবে নেব কিন্তু। ঠিক আছে না? আপনারা কি আমাকে অপমানিত হইতে দেবেন?” এ সময় উপস্থিত কিছু ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ ‘না’ সূচক জবাব দেন। এরপরই তিনি বলেন, “তাইলে সবাই কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারিতে ট্রাক মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন।”
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর তীব্র জনরোষের মুখে পড়েন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তবে তিনি তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ না করে বরং ভিডিওটি ‘বিকৃত’ করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি ছিল মূলত কথার কথা। উঠান বৈঠকটি হয় রাত প্রায় ২টার দিকে। আমি সকাল ৯টা থেকে বের হয়ে সারা দিন ট্রাক প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী সভা ও উঠান বৈঠক করেছি। খুবই ক্লান্ত অবস্থায় কথার কথা বলতে গিয়ে এমন কথা বলেছি। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে।”
যদিও তার নিজের ফেসবুক পেজেই পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যের ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছিল, যা তার ‘বিকৃত’ করার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাত ২টায় ক্লান্ত থাকার অজুহাতে ভোটারদের ঘরবাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর এই বক্তব্যকে দলের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিএনপি। কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সী বলেন, “ভিডিওর বক্তব্যটি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর একান্তই ব্যক্তিগত। এটি দলীয় বক্তব্য নয় এবং এর দায়ভারও দল বহন করবে না। আমরা এ বক্তব্যের জন্য চরমভাবে বিব্রতবোধ করছি।”
স্থানীয় বিএনপির এই বিব্রতকর অবস্থার রেশ কাটাতে মঙ্গলবার রাতেই কেন্দ্র থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত আসে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সংগঠন পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, সন্ত্রাস বা হুমকির রাজনীতিতে বিএনপির কোনো স্থান নেই।
কুমিল্লা-৪ আসনে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ছিলেন বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী। কিন্তু ঋণখেলাপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে। আইনি লড়াইয়েও তিনি হেরে যান। এরপর তিনি কৌশলগত কারণে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জসিম উদ্দিনের ট্রাক প্রতীককে সমর্থন জানালে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী তার পক্ষে আদাজল খেয়ে মাঠে নামেন। কিন্তু নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে এমন বেফাঁস মন্তব্য করে তিনি শুধু নিজের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করেননি, বরং সমর্থিত প্রার্থীর জন্যও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সাবেক এমপির এমন হুমকিতে বাকসার গ্রামসহ পুরো দেবিদ্বার উপজেলার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও বিরোধী মতের ভোটাররা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। স্থানীয়রা বলছেন, একজন দায়িত্বশীল নেতা কীভাবে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো কথা বলতে পারেন, তা তাদের বোধগম্য নয়।
স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন থেকেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন করা গুরুতর অপরাধ। ভিডিওটি আমলে নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এই ঘটনার বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বহিষ্কার এবং জনমনে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দিনের ভোটব্যাংকে ধস নামাতে পারে। অন্যদিকে, বিএনপির মূল স্রোতের নেতাকর্মীরাও এই ঘটনার পর দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়তে পারেন।
রাজনীতিতে বাকসংযম ও শিষ্টাচার যে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রমাণ মিলল কুমিল্লা-৪ আসনের এই ঘটনায়। দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ হয়েও মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী আবেগের বশবর্তী হয়ে যে হুমকি দিয়েছেন, তা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। দল থেকে বহিষ্কার এবং জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া—সব মিলিয়ে দেবিদ্বারের রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিলো এই নির্বাচন। এখন দেখার বিষয়, আগামীকালের ভোটে সাধারণ মানুষ এই হুমকির জবাব ব্যালটের মাধ্যমে কীভাবে দেয়। ইটিসি বাংলা নির্বাচনের প্রতিটি মুহূর্তের খবর আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে সর্বদা তৎপর।
