হাজিরা ফেরত পাবেন ৩ কোটি টাকা—ধর্ম উপদেষ্টার ঘোষণা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবং হজযাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০২৬ সালের হজ প্যাকেজে বড় ধরনের সুখবর দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজ-১-এর যাত্রীদের মক্কা ও মদিনায় হোটেল ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রায় এক হাজার সৌদি রিয়াল কমানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ বছর হজ শেষে প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-২-এর যাত্রীদের অব্যবহৃত অর্থ বাবদ মোট তিন কোটিরও বেশি টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

গতকাল মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান। ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের বিগত দিনের অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।


ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন জানান, হজযাত্রীদের ওপর আর্থিক চাপ কমানো ছিল সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, “যৌক্তিক খরচে হজ পালনের যে জনআকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটি বাস্তবায়নে আমরা শুরু থেকেই বিশেষভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। সৌদি আরবের বিভিন্ন সার্ভিস প্রোভাইডার এবং হোটেল মালিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা এই খরচ কমাতে সক্ষম হয়েছি।”

উপদেষ্টার দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৬ সালের হজ প্যাকেজ-১-এর যাত্রীদের মক্কা ও মদিনায় আবাসন খাতে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পাশাপাশি, হজযাত্রীপ্রতি অভ্যন্তরীণ পরিবহন ভাড়াও ১০০ সৌদি রিয়াল কমানো সম্ভব হয়েছে। সব মিলিয়ে প্যাকেজ-১-এর যাত্রীরা গত বছরের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে হজে যেতে পারবেন।


সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য ছিল হাজিদের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি। সাধারণত হজের টাকা জমা দেওয়ার পর তা ফেরত পাওয়ার নজির খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু এবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।

উপদেষ্টা বলেন, “২০২৬ সালের হজ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আমরা হিসাব-নিকাশ করে দেখেছি যে, প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-২-এর যাত্রীদের জমাকৃত অর্থের একটি অংশ সাশ্রয় হবে। সেই সাশ্রয়কৃত অর্থ, যা সব মিলিয়ে ৩ কোটিরও বেশি, তা আমরা হাজিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত দেব। এটি সরকারের স্বচ্ছতার একটি বড় প্রমাণ।”


হজযাত্রীদের প্রধান খরচের একটি বড় অংশ চলে যায় বিমান ভাড়ায়। এ বিষয়ে গত দুই বছরে সরকারের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেন ধর্ম উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ এবং কঠোর নেগোসিয়েশন বা দরকষাকষির মাধ্যমে বিমান ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, “২০২৫ সালের হজে আমরা বিমান ভাড়া প্রায় ২৭ হাজার টাকা কমিয়েছিলাম। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এ বছর (২০২৬) আরও প্রায় ১৩ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ গত দুই বছরে মোট ৪০ হাজার টাকা বিমান ভাড়া কমানো হয়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন এবং হজযাত্রীদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়।”


বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বা সাধারণ মানের প্যাকেজ-৩-এর যাত্রীদের জন্যও সুখবর রয়েছে। উপদেষ্টা জানান, হজ প্যাকেজ-৩-এর সার্ভিস চার্জ বাবদ সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এর ফলে হজযাত্রীপ্রতি প্রায় ৬০০ সৌদি রিয়াল কমানো সম্ভব হয়েছে। এতে সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির হজযাত্রীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।


ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কথা বলেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি জানান, জনবল সংকটের কারণে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। এই সমস্যা সমাধানে গত দেড় বছরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন শূন্যপদে ১৬৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্বীনি দাওয়াত ও গবেষণামূলক কাজে নতুন গতি আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সারা দেশে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হজের প্রাক-নিবন্ধন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দালালের দৌরাত্ম্য কমাতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।


সংবাদ সম্মেলনে ধর্ম সচিব মো. কামাল উদ্দিন, হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম এবং বাজেট ও অনুদান অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুর রহমানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ধর্ম উপদেষ্টার এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে ডলার সংকট ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে হজের খরচ কমানোর উদ্যোগ এবং টাকা ফেরতের ঘোষণা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত এই প্যাকেজ ও সুযোগ-সুবিধাগুলো মাঠ পর্যায়ে কতটা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়। ইটিসি বাংলা হজের প্রতিটি আপডেট পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন