১৭ কোটি টাকার দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা প্রকাশ্য জনসভায়

মাথায় অর্থঋণ আদালতের ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। কাঁধে ঋণের বোঝা প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে বহু আগে। পুলিশ বলছে তিনি পলাতক, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুলিশের খাতা অনুযায়ী ‘পলাতক’ এই আসামি দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রকাশ্যে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে, এমনকি মাইক হাতে জ্বালাময়ী বক্তব্যও রাখছেন। সিনেমার গল্পের মতো মনে হলেও এমন ঘটনা ঘটছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে।

আলোচিত এই ব্যক্তির নাম আলমগীর আলম বিপ্লব। তিনি হালুয়াঘাট পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাবেক ভিপি। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৭ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এই নেতার প্রকাশ্যে বিচরণ এবং পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে।


ঘটনার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। আদালতের নথি ও ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আলমগীর আলম বিপ্লব ব্যবসায়িক প্রয়োজনে প্রিমিয়ার ব্যাংক ময়মনসিংহ শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো সেই ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ২০১৮ সালে তার বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৪(১) ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা ঋণ খেলাপের দায়ে ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আদালত তাকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও তিনি ঋণ পরিশোধ করেননি। ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মূল টাকার সঙ্গে সুদ ও জরিমানা যুক্ত হয়ে বর্তমানে ব্যাংকের মোট পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়।


আদালতের রায়ের পর আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত দুই বছরেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

সর্বশেষ গত ৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) ২০২৬, অর্থঋণ আদালতের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম জেলা জজ শেখ নাজমুন নাহার হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর একটি অত্যন্ত কড়া ভাষায় তাগিদপত্র (স্মারক নং ৮২) প্রেরণ করেন। আদালতের সেই আদেশে বিচারক পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদেশে উল্লেখ করা হয়, প্রথম ওয়ারেন্ট জারির পর থেকে এ পর্যন্ত আদালত থেকে মোট ২৬ বার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবুও পুলিশ আসামিকে গ্রেপ্তার বা ওয়ারেন্ট তামিল করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, “ওয়ারেন্ট তামিল না হওয়ায় বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং আদালতের আদেশ উপেক্ষিত হচ্ছে।” আদালত আগামী ১৬ মার্চ, ২০২৬ তারিখের মধ্যে ওয়ারেন্ট তামিল সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য হালুয়াঘাট থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।


হালুয়াঘাট থানা পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, আসামি আলমগীর আলম বিপ্লব পলাতক এবং তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বিপ্লব হালুয়াঘাটেই অবস্থান করছেন এবং নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন।

ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের নির্বাচনী প্রচারণায় বিপ্লবকে সম্মুখসারিতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালেও তিনি একটি রাজনৈতিক জনসভায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। যে দিন আদালত তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ২৬তম বারের মতো তাগিদ দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই তিনি হয়তো কোনো এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুলিশের নাকের ডগায় বক্তৃতা করছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “বিপ্লব ভাই তো প্রতিদিনই বাজারে আসেন, দলীয় প্রোগ্রামে যান। পুলিশ তাকে খুঁজে পায় না—এটা হাস্যকর। সাধারণ কোনো মানুষ হলে এতদিনে জেল খাটত, কিন্তু রাজনৈতিক নেতা বলেই হয়তো তার সাত খুন মাফ।”


প্রিমিয়ার ব্যাংকের ময়মনসিংহ শাখার ব্যবস্থাপক রাহাত হোসেন এ বিষয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি ইটিসি বাংলাকে বলেন, “একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথচ রহস্যজনক কারণে তাকে ধরা হচ্ছে না। এটি আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। বিপুল অঙ্কের এই টাকা আদায় না হওয়ায় আমাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পুলিশের সহযোগিতা না পেলে এই টাকা উদ্ধার করা অসম্ভব।”


এ বিষয়ে হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তার মোবাইল ফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

তবে হালুয়াঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মিজানুর রহমান বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি এভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সত্যিই দুঃখজনক। আমি বিষয়টি জানার পরপরই ওসিকে নির্দেশ দিয়েছি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।”

অন্যদিকে, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আতাউল কিবরিয়া বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তিনি জানান, “ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমি পুলিশ সুপারকে (এসপি) সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেব যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।”


নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে এমন একজন বিতর্কিত ও সাজাপ্রাপ্ত নেতার প্রচারণা চালানো নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দলের তৃণমূলের অনেক কর্মী মনে করেন, ঋণ খেলাপি ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তবে প্রকাশ্যে কেউ এ নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। অন্যদিকে, সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, যদি ১৭ কোটি টাকা আত্মসাৎকারী ব্যক্তি এভাবে পার পেয়ে যান, তবে সমাজে সুশাসনের অভাব প্রকট হয়ে উঠবে।


আদালতের ২৬ বারের তাগিদ, ১৭ কোটি টাকার বিশাল ঋণ এবং ৬ মাসের কারাদণ্ড—সবকিছুকে উপেক্ষা করে আলমগীর আলম বিপ্লব যেভাবে প্রকাশ্যে ঘুরছেন, তা হালুয়াঘাট পুলিশের দক্ষতা ও সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আগামী ১৬ মার্চ আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে পারে কি না, নাকি ‘পলাতক’ নাটকের পুরনো স্ক্রিপ্টেই অভিনয় চালিয়ে যায়—সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইটিসি বাংলা এই ঘটনার শেষ পর্যন্ত নজর রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন