নির্বাচন ঘিরে আ.লীগনেতা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ক্যাডাররা অবৈধ অস্ত্রের নিয়ে আসছে

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির এক ভয়াবহ নীল নকশা উন্মোচিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ফেনী ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই অস্ত্র চোরাচালান ও সশস্ত্র প্রশিক্ষণের নেপথ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক ক্যাডাররা।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েক দফায় ভারত সীমান্ত দিয়ে শতাধিক অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করেছে দুই থেকে তিনটি সিন্ডিকেট। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে (২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর) অন্তত ১০ থেকে ১৪টি আধুনিক শর্টগান ও পিস্তল ফেনী সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে। এসব অস্ত্রের বেশিরভাগই আনা হয়েছে পরশুরাম সীমান্তের বিলোনিয়া এলাকা দিয়ে। এছাড়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও ফেনীর ছাগলনাইয়া সীমান্তকেও রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের অন্তত সাতজন নেতা আগরতলায় অবস্থান করে ৫০ জনের একটি বিশেষ দলকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দলের মধ্যে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক দুজন শীর্ষ নেতাও রয়েছেন।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল জোগানদাতা হিসেবে উঠে এসেছে দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম: ১. আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম: ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা। ২. মহিবুল আলম মজুমদার কানন: সাবেক রেলমন্ত্রী মজিবুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি।

সীমান্ত পারাপারে প্রতিটি অস্ত্রের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে কমিশন দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ভারতের আসাম থেকে আসা এসব অস্ত্র পরিবহনে মাদক চোরাচালানিদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

  • ধর্মপুর সীমান্ত: বরইয়া এলাকা দিয়ে অস্ত্র আনায় রিয়াদ ও ভূট্টো নামে দুই ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
  • ফুলগাজী সীমান্ত: সাফায়েত আহম্মদ পাটোয়ারী রাকিব ও শেখ ফরিদকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে বিজিবি ও পুলিশ। এরা মাদক চোরাচালানের আড়ালে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করে।
  • খাগড়াছড়ি কানেকশন: হারেস নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে খাগড়াছড়ি থেকেও রিভলভার ও শর্টগানের অর্ডার দেওয়া হয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।

ফেনী জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৪টি দেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

  • অক্টোবর: ১টি অস্ত্র, ২ টি ম্যাগাজিনসহ ৩ জন গ্রেপ্তার।
  • নভেম্বর: ২ টি অস্ত্র, ২ টি কার্তুজসহ ২ জন গ্রেপ্তার।
  • জানুয়ারি: ১ টি অস্ত্র উদ্ধার।
  • সর্বশেষ অভিযান: গত বুধবার রাতে ছাগলনাইয়ার বাগানবাড়ি এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি ম্যাগাজিন ও দুই রাউন্ড গুলিসহ একটি অস্ত্র উদ্ধার করেছে বিজিবি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, নির্বাচনে সব ধরনের অপতৎপরতা রোধে তাদের গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার রয়েছে। অন্যদিকে, ফেনীস্থ ৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, “নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবি ও বিএসএফ সীমান্তে পাহারা বাড়িয়েছে। যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান রোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পলাতক নেতাদের মদদে এই অস্ত্র আনা ও ক্যাডারদের প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা এবং নির্বাচনের দিন অরাজকতা তৈরি করা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকলে এই নাশকতামূলক পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন