লাতিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া রাজ্যে আবারও মানবতার চরম অবমাননা। মাদক কার্টেলগুলোর বিবাদমান সংঘাতের জেরে প্রাণ গেল নিরীহ শ্রমিকদের। গত মাসে অপহৃত ১০ জন খনি শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেছে মেক্সিকোর পুলিশ ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনা দেশটির খনি শিল্প এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিনালোয়া রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা ‘এল ভার্দে’তে একটি নির্জন সম্পত্তি থেকে পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বীভৎস এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। উদ্ধারকৃত দেহগুলো এতটাই বিকৃত অবস্থায় ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে প্রাথমিক তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এরা গত মাসে অপহৃত সেই খনি শ্রমিকদেরই অংশ।
বাকি পাঁচজন শ্রমিকের ভাগ্য নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে উদ্ধার হওয়া অন্যান্য দেহাবশেষ বা হাড়গোড় পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে সেগুলো নিখোঁজ বাকি পাঁচজনের কি না। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য। প্রসিকিউটরিয়াল কর্তৃপক্ষ নিহতদের পরিবারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছেন এবং তাদের সব ধরনের আইনি ও মানসিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন।
উক্ত খনিটি পরিচালনা করত কানাডার ভ্যাঙ্কুভারভিত্তিক স্বনামধন্য খনি কোম্পানি ‘ভিজলা সিলভার’ (Vizsla Silver)। গত ২৮ জানুয়ারি তাদের খনি এলাকা থেকে কর্মীদের অপহরণ করা হয়েছিল। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপহরণের পরপরই তারা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি অবহিত করেছিল, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।
ভিজলা সিলভারের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল কোনার্ট এক আবেগঘন বিবৃতিতে বলেন, “এই মারাত্মক পরিস্থিতিতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকস্তব্ধ। আমাদের সহকর্মীদের এমন নিষ্ঠুর পরিণতি আমরা মেনে নিতে পারছি না। অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের মৃত অবস্থায় পেয়েছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমাদের এখন মূল লক্ষ্য হলো নিখোঁজ বাকিদের দেহাবশেষ বা খোঁজ নিরাপদে পুনরুদ্ধার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থেকে তাদের সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা।”
এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত সপ্তাহে বিশেষ অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে মেক্সিকোর পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে বা কোন উদ্দেশ্যে এই শ্রমিকদের হত্যা করা হলো, তা এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় কার্টেলগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি অথবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর অংশ হিসেবেই এই নিরীহ শ্রমিকদের টার্গেট করা হয়েছিল।
সিনালোয়া রাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরেই মেক্সিকোর মাদক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে সহিংসতা চরমে পৌঁছেছে। এর মূল কারণ হলো কুখ্যাত ‘সিনালোয়া কার্টেল’-এর অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কার্টেলের দুই কিংবদন্তি সহ-প্রতিষ্ঠাতা—ইসমাইল ‘এল মায়ো’ জাম্বাদা এবং জোয়াকিন ‘এল চ্যাপো’ গুজম্যানের অনুসারীদের মধ্যে এখন চলছে রক্তক্ষয়ী ক্ষমতা দখলের লড়াই।
উল্লেখযোগ্য যে, ‘এল চ্যাপো’ গুজম্যান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে বন্দি। অন্যদিকে, গত বছর নাটকীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হন আরেক শীর্ষ নেতা ইসমাইল ‘এল মায়ো’ জাম্বাদা। এই দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে কার্টেলটি ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক পক্ষে রয়েছে এল মায়োর অনুগতরা, অন্য পক্ষে রয়েছে এল চ্যাপোর ছেলেরা, যারা ‘লস চ্যাপিতোস’ নামে পরিচিত। এই দুই পক্ষের সংঘাতের আগুনের আঁচেই পুড়ছে সিনালোয়ার সাধারণ মানুষ, যার সর্বশেষ বলি হলেন এই খনি শ্রমিকরা।
মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় এই রাজ্যে ২০২৫ সালটি শুরু হয়েছে ভয়াবহ রক্তপাত দিয়ে। স্থানীয় বাণিজ্যের হিসাব এবং প্রভাবশালী দৈনিক ‘মিলেনিও’র (Milenio) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সিনালোয়ায় ১,৬৮০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত এক দশকের মধ্যে এটিই সবচেয়ে সহিংস বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অপহরণ, গুম এবং প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মেক্সিকো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রৌপ্য উৎপাদনকারী দেশ এবং সিনালোয়া রাজ্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। কিন্তু কার্টেলগুলোর দৌরাত্ম্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভিজলা সিলভারের মতো বড় কোম্পানির কর্মীদের অপহরণ ও হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো এখন আর কেবল মাদক ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই; তারা খনি ও অন্যান্য বৈধ ব্যবসার ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার যদি দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে মেক্সিকোর খনি শিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
মেক্সিকোর সরকার এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিলেও, সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক কমছে না। সিনালোয়ার প্রতিটি পরিবার এখন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অপহৃত শ্রমিকদের পরিবারের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এল ভার্দের বাতাস। বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা, মেক্সিকো সরকার এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনবে।
ইটিসি বাংলা মেক্সিকোর এই পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখছে।
