দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া এখন তুঙ্গে। রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ভিআইপি এলাকা হিসেবে পরিচিত ঢাকা-১২ আসন (ফার্মগেট, তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর)। এই আসনে এবার সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ১৫ জন প্রার্থী এখানে জয়ের জন্য লড়ছেন। তবে ভোটের মাঠে প্রার্থীদের সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সক্ষমতা ও পেশিশক্তির প্রদর্শন। বিত্তবান ও বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার আর জমকালো প্রচারণায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন স্বল্প আয়ের বা ‘দরিদ্র’ প্রার্থীরা।
অর্থবিত্তের এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক প্রার্থীই হতাশ। তবে কেউ কেউ হার না মেনে অভিনব কৌশলে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এমনই এক সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে ঢাকা-১২ আসনের নির্বাচনী মাঠে।
জনতার দলের প্রার্থী ফরিদ আহমেদ। তার প্রতীক ‘কলম’। তিনি মূলত ‘মৌলিক বাংলা’ নামের একটি রাজনৈতিক দলের সভাপতি, তবে দলটির নিবন্ধন না থাকায় তিনি জনতার দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নিজেকে তিনি একজন ‘দরিদ্র’ প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
নির্বাচনী মাঠে যখন কোটি কোটি টাকা উড়ছে, তখন ফরিদ আহমেদ লড়াই করছেন তার সীমিত সামর্থ্য নিয়ে। তিনি জানান, অন্য প্রার্থীরা যেখানে হাজার হাজার ব্যানার-ফেস্টুনে এলাকা ছেয়ে ফেলছেন, সেখানে তিনি তার বন্ধু ও বিদেশি কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতায় মাত্র ১২০টি প্ল্যাকার্ড ও ৭০টি ব্যানার তৈরি করতে পেরেছেন। এই স্বল্প প্রচার উপকরণ বিশাল এই নির্বাচনী এলাকায় দৃশ্যমান করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে দমে যাননি ফরিদ। প্রচারণায় এনেছেন ভিন্নতা। চার চাকার একটি স্কুটিকে তিনি সাজিয়েছেন নিজের নির্বাচনী বাহন হিসেবে। স্কুটির চারপাশে ছোট ছোট ব্যানার লাগিয়ে এবং মাইক বেঁধে তিনি ছুটে চলছেন তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেটের অলিগলিতে। নিজেই ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, তুলে ধরছেন তার উন্নয়নের বার্তা। ফরিদ আহমেদ বলেন, “বড় দলের প্রার্থীদের পেশিশক্তি ও টাকার কাছে আমরা পেরে উঠছি না। দরিদ্র প্রার্থী হিসেবে টিকে থাকা খুব কষ্টকর। তবে আমার বিশ্বাস, যদি সব মানুষের কাছে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে পারি, তবে ভোটাররা আমাকেই বেছে নেবেন।”
এই আসনের আরেক প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের (এনডিএম) মোমিনুল আমিন। তার প্রতীক ‘সিংহ’। তিনিও অভিযোগ করেছেন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও পেশিশক্তির প্রয়োগ নিয়ে। তিনি জানান, প্রচারের শুরুতেই তিনি এলাকায় ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড লাগিয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিপক্ষের লোকেরা পরিকল্পিতভাবে তা ছিঁড়ে ফেলেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে তার দাবি।
শারীরিক প্রচারণায় বাধা পেয়ে মোমিনুল আমিন বেছে নিয়েছেন ডিজিটাল মাধ্যম। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি ইতিমধ্যে ৮৯ হাজার ভোটারের কাছে পৌঁছেছেন। তিনি ভোটারদের সমস্যাগুলো শুনে সে অনুযায়ী তার ইশতেহার সাজাচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি এমন সব এলাকায় যাচ্ছেন, যেখানে সচরাচর বড় দলের প্রার্থীরা যান না। তার মতে, “এবারের ভোট হবে ভিন্ন। মানুষ আর শুধু মার্কা দেখে ভোট দেবে না। অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও এবার হেরে যাবেন। ফলাফল হবে চমকপ্রদ।”
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির রাজনীতিতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের নাটকীয়তা। শুরুতে এই আসনে ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জোটগত সমীকরণের কারণে তাকে সরিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন দেয় বিএনপি। সাইফুল হকের প্রতীক ‘কোদাল’।
দলের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি সাইফুল আলম নীরব। তিনি বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন এবং তার প্রতীক ‘ফুটবল’। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে বিএনপি ও সমমনা ভোটারদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি ও বিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, শেরেবাংলা নগর, নাখালপাড়া ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ‘কোদাল’ ও ‘ফুটবল’ প্রতীকের পোস্টারের ছড়াছড়ি। এর সাথে পাল্লা দিচ্ছে অন্যান্য বড় দলের প্রার্থীরা।
সরেজমিনে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও হাতিরঝিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। তবে ছোট দলগুলোর প্রার্থীরাও নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী মোহাম্মাদ শাহজালাল ‘মোমবাতি’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বড় দলের প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন। তারা প্রতি রাতে নতুন নতুন ব্যানার লাগাচ্ছেন। আমাদের লাগানো গুটিকয়েক ব্যানারও তারা ছিঁড়ে ফেলছে।”
জাতীয় পার্টির প্রার্থী সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে আছেন। তিনি মনে করেন, ভোটের প্রচার এখন পুরোপুরি আর্থিক সচ্ছলতার ওপর নির্ভরশীল। তবে তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষ তাকে পছন্দ করে, যা তাকে পাস-ফেলের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী কল্লোল বনিক (কাস্তে প্রতীক) নির্বাচনকে ‘টাকার খেলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আগের মতোই এই আসনে পেশিশক্তির প্রদর্শনী চলছে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার এখানে অর্থের দাপটে কোণঠাসা।”
ঢাকা-১২ আসনে মোট ভোটার প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৫ জন প্রার্থী, যা দেশের যেকোনো আসনের তুলনায় সর্বোচ্চ। উল্লিখিত প্রার্থীরা ছাড়াও মাঠে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), গণ অধিকার পরিষদের আবুল বাশার চৌধুরী (ট্রাক), গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার (মাথাল), ইনসানিয়াত বিপ্লবের সালমা আক্তার (আপেল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের মুনতাসির মাহমুদ (ছড়ি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নাঈম হাসান (কাঁঠাল) ও আমজনতার দলের মো. তারেক রহমান (প্রজাপতি)।
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, প্রার্থীদের প্রচারণায় ততই গতি বাড়ছে। তবে ফরিদ আহমেদের মতো স্বল্প আয়ের প্রার্থীরা তাদের সততা ও অভিনব কৌশল দিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। অর্থের ঝনঝনানি নাকি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা—শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে, তা জানা যাবে ভোটের দিন।
