এমপিদের শুল্ক মুক্তগাড়ি সুবিধা বাতিলের ঘোষণা জামায়াত আমিরের

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গুণগত পরিবর্তনের ডাক দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে এই দেশকে আর কখনোই বিভক্ত করতে দেওয়া হবে না। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, আগামীতে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে, কোনো বিশেষ পরিচয়ে নয়। একইসাথে তিনি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ত্যাগের এক নজিরবিহীন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে সংসদ সদস্যরা (এমপি) প্রচলিত শুল্কমুক্ত গাড়ি কিংবা স্বল্পমূল্যের প্লট সুবিধা গ্রহণ করবেন না।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে হবিগঞ্জ জেলা সদরে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পের আধুনিকায়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।


জনাকীর্ণ সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা সমাজে সব ধরনের বিভক্তিকে ঘৃণা করি। এই ভূখণ্ডে যুগ যুগ ধরে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের প্রতিবেশী হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশ মূলত একটি ফুলের বাগানের মতো, যেখানে প্রতিটি ফুল তার নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে ফোটে। ইসলাম কখনোই ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বাড়াবাড়ি বা বৈষম্য পছন্দ করে না।”

তিনি উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করে বলেন, “বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব স্বাধীনভাবে পালন করবেন। এতে কেউ কোনো ধরনের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চাই যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকারের কোনো পার্থক্য থাকবে না।”


রাজনীতিকে ‘পেশা’ হিসেবে গ্রহণ করার প্রচলিত সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে রাজনীতি কোনো পেশা বা ব্যবসার মাধ্যম নয়; বরং এটি আমাদের জন্য একটি নৈতিক কর্তব্য ও ইবাদত। অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনীতির নামে একদল লোক চাঁদাবাজিকে শিল্পে পরিণত করেছে। এমনকি ভিক্ষুকদের কাছ থেকেও চাঁদা নিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করেনি। আমরা কথা দিচ্ছি, এদেশে আর কোনো চাঁদাবাজি চলবে না। চাঁদাবাজির সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করা হবে।”

নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “অসৎ নেতৃত্বের কারণে অপার সম্ভাবনাময় এই দেশের মানুষের ভাগ্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। আমরা নির্বাচিত হলে স্বচ্ছতার এক নতুন নজির স্থাপন করব। বছরে একবার আমরা জনগণের সামনে আমাদের আয়-ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দাখিল করব। জনগণ জানবে তাদের সম্পদ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে।”


বক্তব্যের এক পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার বিষয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “জামায়াত ইসলামীর কোনো প্রতিনিধি সংসদে গেলে তারা শুল্কমুক্ত (ট্যাক্স ফ্রি) গাড়ি আমদানির সুবিধা নেবেন না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বিলাসিতা করার দিন শেষ। প্রয়োজনে আমাদের এমপিরা রিকশায় চড়বেন, তবু রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপচয় করবেন না।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ঢাকা শহরে এমপিদের নামমাত্র মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে যে প্লট বা ফ্ল্যাট দেওয়া হয়, জামায়াতের এমপিরা সেটাও গ্রহণ করবেন না। যার নিজস্ব সামর্থ্য আছে, তিনি নিজের অর্থে গাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনবেন। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার প্রথা আমরা ভেঙে দেব।”


হবিগঞ্জের স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণ ‘চা শিল্প’ নিয়ে কথা বলেন জামায়াত আমির। তিনি চা শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “চা বাগানের শ্রমিকরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন, অথচ তারা অবহেলিত। আমরা ক্ষমতায় গেলে হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে এবং চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।” মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “চাকরির ক্ষেত্রে মামা-চাচার জোর নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি।”


বিগত সরকারের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “পুরো দেশ আজ সন্ত্রাস ও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। এর সম্পূর্ণ দায় পূর্ববর্তী ক্ষমতাধর শাসকদের। তারা দেশকে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল।”

তিনি নারীদের সম্মানের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “যারা আমাদের মা-বোনদের অপমান করেছেন, তাদের ১৮ কোটি মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। বৈষম্যহীন একটি দেশ গড়ার জন্য ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে। অথচ অসৎ রাজনীতির চর্চা করে একটি গোষ্ঠী সেই বৈষম্য জিইয়ে রাখতে চায়। তাদের এই স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না।”

সমাবেশে জেলা ও উপজেলার স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। হাজারো মানুষের স্লোগানে মুখরিত এই জনসভায় জামায়াত আমির আগামী নির্বাচনে জনগণের রায় প্রার্থনা করেন এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন