আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়া এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাদারীপুর জেলা শাখার সভাপতিসহ মোট ১৫ জন শীর্ষ নেতাকে তাদের দলীয় পদ থেকে স্থগিত করা হয়েছে।
শুক্রবার (রাত ৯টার দিকে) মাদারীপুর জেলা কার্যনির্বাহী কমিটির এক জরুরি সভা শেষে এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মিসবাহুল ইসলাম। একইসাথে সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল রাখার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে মাওলানা লোকমান হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে একসঙ্গে এতজন জ্যেষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে মাদারীপুর শহরের আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন জেলা কার্যালয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলা কার্যনির্বাহী কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন দলের নীতিনির্ধারক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।
সভায় অভিযোগ উত্থাপিত হয় যে, দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করার লক্ষ্যে কাজ না করে, দলের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে অন্য একটি ইসলামী দলের (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। দীর্ঘ আলোচনা ও প্রমাণাদি বিশ্লেষণের পর, কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাথে পরামর্শক্রমে অভিযুক্ত ১৫ নেতার পদ স্থগিত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
যাদের পদ স্থগিত করা হয়েছে
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত নেতাদের তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং এতে জেলার শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব পদের নেতারাই রয়েছেন। পদ স্থগিত হওয়া নেতাদের তালিকা নিম্নে দেওয়া হলো:
১. মাওলানা হাবীব আহমদ চৌধুরী – মাদারীপুর জেলা কমিটির সভাপতি।
২. মাওলানা ফখরুল ইসলাম – সহসভাপতি।
৩. মুফতি উসামা খান মাদানী – সহসভাপতি।
৪. মাওলানা ইমরান হুসাইন খান – সহসভাপতি।
৫. মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ ফাহমী – সহসভাপতি।
৬. মাওলানা শাহ জালাল খান – সহসাধারণ সম্পাদক।
৭. মাওলানা মারুফ বিল্লাহ সাক্বাফী – সহসাধারণ সম্পাদক।
৮. মাওলানা নোমান আল হাবীব – সহসাংগঠনিক সম্পাদক।
৯. মাওলানা সাজিদুল ইসলাম – সহ-অফিস সম্পাদক।
১০. মুফতি ইমরান কাজী – সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।
১১. মুফতি সরোয়ার হোসেন – জেলা নির্বাহী সদস্য।
১২. মাওলানা আবুল বাশার – রাজৈর উপজেলা সভাপতি।
১৩. মাওলানা অহিদুজ্জামান – রাজৈর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক।
১৪. মাওলানা এনায়েতুল্লাহ – সদর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক।
১৫. মাওলানা শাহ আলম তালুকদার – শিবচর উপজেলা সভাপতি।
এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে, জেলা কমিটি থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এই বিদ্রোহের সাথে জড়িত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা লোকমান হোসেন ঘটনার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে ১১ দলীয় জোট ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে মাদারীপুরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
- মাদারীপুর–১ আসন: এখানে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জনাব সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা।
- মাদারীপুর–২ আসন: এই আসনে প্রার্থী করা হয়েছে মুফতি আব্দুস সোবাহানকে।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সকল নেতাকর্মীর দায়িত্ব ছিল এই দুই প্রার্থীর ‘রিকশা’ বা দলীয় প্রতীকের পক্ষে কাজ করা। কিন্তু অভিযুক্ত নেতারা দলের এই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর (হাতপাখা প্রতীক) পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। নির্বাচনী মাঠে নিজ দলের প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে অন্য দলের প্রার্থীর হয়ে ভোট চাওয়াকে সংগঠনের প্রতি ‘চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দলের বর্তমান নেতৃত্ব।
মাদারীপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মিসবাহুল ইসলাম ইটিসি বাংলাকে বলেন, “রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করা শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। আমরা লক্ষ্য করেছি, আমাদের দলের দায়িত্বশীল পদে থেকে তারা অন্য দলের প্রার্থীর লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি দলের সাথে এবং সাধারণ কর্মীদের আবেগের সাথে বেঈমানী।”
তিনি আরও জানান, কেবল পদ স্থগিত করেই দল ক্ষান্ত হয়নি। অভিযুক্তদের আগামীতে কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না—এই মর্মে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে তাদের দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এছাড়া, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই ১৫ নেতা দলের কোনো পদ-পদবী ব্যবহার করতে পারবেন না বলেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে জেলা সভাপতিসহ ১৫ জন নেতার পদ স্থগিত করার ঘটনা মাদারীপুর খেলাফত মজলিসের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। একদিকে যেমন এটি দলের কঠোর শৃঙ্খলার বার্তা দেয়, অন্যদিকে ভোটের মাঠে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এই ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
