নতুন মন্ত্রিসভায় যে তিন হেভিওয়েট ও চমকপ্রদ মুখ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মহাযজ্ঞ শেষে এখন চলছে সরকার গঠনের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে আসছে বিএনপি। ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আর আজ মঙ্গলবার বিকেলেই বঙ্গভবন বা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ। ৪৯ সদস্যের এই নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে ‘টেকনোক্র্যাট কোটায়’ মন্ত্রী হিসেবে যে তিনজনের নাম উঠে এসেছে, তা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা বলে সংসদ সদস্য না হয়েও মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন ড. খলিলুর রহমান, হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াছিন এবং সাবেক ফুটবলার আমিনুল হক। এই প্রতিবেদনে আমরা জানবো টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী আসলে কী এবং এই তিনজনের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও রাজনীতির অন্দরমহলের খবর।


সাধারণত আমরা জানি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মেধা ও বিশেষায়িত জ্ঞানের কদর করতে সংবিধানে একটি বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ‘টেকনোক্র্যাট কোটা’ নামে পরিচিত।

সহজ কথায়, ‘টেকনোক্র্যাট’ (Technocrat) বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি পেশাদার রাজনীতিবিদ না-ও হতে পারেন, অথবা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে আসেননি; কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাষ্ট্রপরিচালনা বা নীতিনির্ধারণে এই বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগাতেই তাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্বাচন করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত ১০ ভাগের ৯ ভাগ (৯০%) অবশ্যই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে হতে হবে। বাকি ১০ ভাগের ১ ভাগ (১০%) সদস্য প্রধানমন্ত্রী চাইলে সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে পারেন। এই ১০ শতাংশ সদস্যই হলেন ‘টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী’। তবে তাদের অবশ্যই সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা (যেমন বয়স, নাগরিকত্ব ইত্যাদি) থাকতে হবে।

সাধারণত নির্বাচনের আগে বা সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে এই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করার রেওয়াজ রয়েছে। নতুন সরকারে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী থাকছেন। আনুপাতিক হারে এই কোটায় এবার তিনজন স্থান পেয়েছেন।
নতুন মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি মূলত একজন পেশাদার কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ। রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় না থাকলেও রাষ্ট্রপরিচালনায় তার অভিজ্ঞতা ঈর্ষণীয়।

সর্বশেষ তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান উপদেষ্টার ‘রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি’ সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তার কূটনৈতিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

তার শিক্ষাজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। ১৯৭৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে এবং ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘের সচিবালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার এই বিশাল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই তাকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হচ্ছে।


টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বিতীয় পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াছিন। তিনি কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য।

হাজি ইয়াছিনের মন্ত্রী হওয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দলের প্রতি তার আনুগত্য ও ত্যাগের পুরস্কার হিসেবে দেখছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কুমিল্লা-৬ (সদর) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তে এই আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয় দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরীকে।

দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এমনকি তিনি স্বতন্ত্র হিসেবেও নির্বাচনে অংশ নেননি, যা দলের হাইকমান্ডের কাছে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। হাজি ইয়াছিন এর আগে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে তিনি পরাজিত হন। এবার এমপি না হয়েও মন্ত্রিত্ব পাওয়ার মাধ্যমে তিনি রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরলেন।
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হককে। তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন।

আমিনুল হকের এই নিয়োগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। কারণ, কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয়ে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার নজির এর আগে নেই। আমিনুল হক এবার ঢাকা-১৬ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এবং জোটের শরিক কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেনের কাছে তিনি পরাজিত হন। পরাজিত হওয়ার পরও তাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ক্রীড়াঙ্গনে জনপ্রিয়তার কারণে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সাবেক তারকা ফুটবলারদের মধ্যে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম প্রথম মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক ফুটবলার আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমিনুল হক হতে যাচ্ছেন তৃতীয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার, যিনি মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেতে চলেছেন। গোলপোস্টের নিচে এক সময় যেমন অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন, এবার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে তিনি কতটা সফল হন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের অন্তর্ভুক্তি মন্ত্রিসভায় এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করে। ড. খলিলুর রহমানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, হাজি ইয়াছিনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং আমিনুল হকের তারুণ্য ও ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিনিধিত্ব—সব মিলিয়ে নতুন সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আজ বিকেলের শপথের মধ্য দিয়ে তাদের এই নতুন পথচলা শুরু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন