নওগাঁর বদলগাছিতে এক চিলতে জমি ও বাঁশঝাড়ের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষ পর্যন্ত রূপ নিল প্রাণহানি আর শোকে। দীর্ঘ ৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হেরে গেলেন আইয়ুব হোসেন (৬৫)। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) সকালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছা মাত্রই শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং একইসঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে চরম উত্তেজনা। নিহত আইয়ুব হোসেন উপজেলার বিলাশবাড়ি ইউনিয়নের হলুদবিহার গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
হাসপাতাল ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) সকালে সংঘর্ষের পর গুরুতর আহত অবস্থায় আইয়ুব হোসেনকে প্রথমে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার মাথায় গভীর ক্ষত এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।
গত এক সপ্তাহ ধরে রামেক হাসপাতালের আইসিইউতে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। তার মাথার খুলিতে গুরুতর আঘাত থাকায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল বলে জানান চিকিৎসকরা। পরিবারের সদস্যরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন তার সুস্থ হয়ে ফেরার। কিন্তু মঙ্গলবার ভোরে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিহতের ছেলে মাহাবুব আলম সুরুজ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বাবাকে ওরা পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যেই মাথায় কোপ দিয়েছিল। ৮টা দিন বাবা আমার যন্ত্রণায় কাতরালেন, কিন্তু আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন। আমি আমার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।”
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, সোমবার সকাল ১০টার দিকে। বিলাশবাড়ি ইউনিয়নের হলুদবিহার গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে আইয়ুব হোসেনের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী একটি পক্ষের জমি ও পারিবারিক কবরস্থানে থাকা একটি বাঁশঝাড় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন সকালে আইয়ুব হোসেন ও তার ছেলেরা নিজেদের জমিতে ধান রোপণ করতে যান। এ সময় প্রতিপক্ষরা দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, হাসুয়া ও লোহার রড নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। আইয়ুব হোসেন বাধা দিতে গেলে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে তার মাথায় গুরুতর জখম হয় এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বাবাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার ছেলে মাহাবুব আলম সুরুজ ও আত্মীয় রেজাউল ইসলামসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
হামলাকারীরা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা নারীদের ওপরও চড়াও হয় তারা। পরে গ্রামবাসী এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। রক্তে রঞ্জিত হয় সদ্য রোপণ করা ধানের খেত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিরোধের মূল কারণ কেবল জমি নয়, বরং পারিবারিক কবরস্থানের সীমানা ও সেখানে থাকা একটি পুরোনো বাঁশঝাড়। ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রতিপক্ষরা দীর্ঘদিন ধরেই জোরপূর্বক ওই জমি ও বাঁশঝাড় দখলের চেষ্টা করে আসছিল।
আইয়ুব হোসেন নিজের জানমাল রক্ষার্থে এবং আইনি প্রতিকার পেতে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এছাড়া নওগাঁ আদালতে এ সংক্রান্ত একাধিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। আদালত থেকে ওই জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনা থাকলেও প্রতিপক্ষরা তা তোয়াক্কা করেনি।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রতিপক্ষরা জোরপূর্বক জমিতে ধান রোপণ ও বাঁশ কাটতে গিয়েছিল। আইনি কাগজ দেখিয়ে বাধা দেওয়াই কাল হলো আইয়ুব হোসেনের জন্য।
আইয়ুব হোসেনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হলুদবিহার গ্রামে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় আবারও সংঘর্ষ বা বাড়িঘরে হামলার আশঙ্কায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। গ্রামের পুরুষদের অনেকেই গ্রেফতার আতঙ্কে এলাকা ছেড়েছেন।
এ বিষয়ে বদলগাছি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমান ইটিসি বাংলাকে বলেন, “খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমরা ঘটনার দিনই খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম। আজ সকালে ভিকটিম মারা গেছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে।”
ওসি আরও জানান, “হামলার ঘটনার পর পরই আমরা অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্তদের মধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। আগে এটি মারামারি ও হত্যাচেষ্টার মামলা ছিল, এখন যেহেতু ভিকটিম মারা গেছেন, তাই এটি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যা মামলায় রূপান্তর হবে। পলাতক বাকি আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, অপরাধীরা যেই হোক তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
স্থানীয় সমাজসেবকরা মনে করছেন, সামান্য জমি নিয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে আদালতে মামলা চলমান থাকার পরও গায়ের জোরে জমি দখলের মানসিকতা থেকেই এমন ঘটনা ঘটছে।
নিহতের প্রতিবেশী আব্দুল মালেক বলেন, “আইয়ুব ভাই খুব শান্ত মানুষ ছিলেন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বলেই নিজে মারামারি করতে যাননি, শুধু বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু ওরা তাকে মেরেই ফেলল। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
আইয়ুব হোসেনের মৃত্যুতে তার পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারানোর হাহাকার চলছে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, যেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা হয় এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
আজ মঙ্গলবার দুপুরের পর ময়নাতদন্ত শেষে আইয়ুব হোসেনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হবে বলে জানা গেছে। বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে—যে কবরস্থান ও বাঁশঝাড় নিয়ে এই বিরোধ—হয়তো সেখানেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। রেখে যাবেন এক অমীমাংসিত বিরোধ আর বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
