বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আজ, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। এই মাহেন্দ্রক্ষণে রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নাম নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল—তিনি হলেন ড. খলিলুর রহমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিজয়ী দলের পক্ষ থেকে ড. খলিলুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তার কর্মদক্ষতা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষায় তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো তাকে নতুন সরকারের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে একজন নির্দলীয় পেশাজীবী বা টেকনোক্র্যাট হিসেবে তার এই অন্তর্ভুক্তিকে বিশ্লেষকরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। এটি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
ড. খলিলুর রহমান সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ‘রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি’ সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান। এই পদে থাকাকালীন তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। পরবর্তীতে, দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার (NSA) দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর পদে তার সফল বিচরণ তাকে রাষ্ট্রপরিচালনায় অপরিহার্য করে তুলেছে।
ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন মেধা ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন অসামান্য মেধার অধিকারী। ১৯৭৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে তিনি তার পেশাগত জীবন শুরু করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টাফটস ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এই তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ তাকে একজন দক্ষ নীতিনির্ধারকে পরিণত করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে এবং ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তাকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে বদলি করা হয়, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনীতির মূল স্রোতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া, ১৯৯১ সালে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন। অর্থনীতি ও কূটনীতির এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে নতুন মন্ত্রিসভায় এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উৎসবের আমেজ। গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোট এক ল্যান্ড স্লাইড ভিক্টরি বা ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। ৩০০টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিএনপির ষষ্ঠবারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণের ঘটনা।
আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকায় নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে উপস্থিত থাকবেন।
এবারের নির্বাচনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা। বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দিয়ে এবার সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তারা ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা দলটির ইতিহাসে এক বড় সাফল্য। দলটির সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ডা. শফিকুর রহমান। সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপি জোটের সরকার গঠন এবং জামায়াতের শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান—সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ড. খলিলুর রহমানের মতো একজন অভিজ্ঞ টেকনোক্র্যাটকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, নতুন সরকার কেবল রাজনৈতিক বিবেচনাই নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ড. খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা নতুন সরকারের জন্য ‘অ্যাসেট’ বা সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
জনগণের প্রত্যাশা, নির্বাচিত সরকার এবং অভিজ্ঞ টেকনোক্র্যাটদের সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন মন্ত্রিসভা দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। শপথের পর থেকেই শুরু হবে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা, যার দিকে তাকিয়ে আছে সমগ্র বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল।
