গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হতে গিয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে। কিন্তু সেই ভোট দেওয়াই যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি সিরাজগঞ্জের হতদরিদ্র দিনমজুর আব্দুল মোতালেব কাজী। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই পুলিশের গুলিতে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবলের শটগান থেকে ছোড়া গুলি মোতালেবের দুই পা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা শঙ্কামুক্ত নয় এবং তিনি ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন কি না, তা নিয়েও রয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াখোলা ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চল বড় কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মোতালেব। অভাবের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দিনমজুরি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে চলে সংসার। গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে উৎসবমুখর পরিবেশে তিনি ভোট দিতে গিয়েছিলেন স্থানীয় মুজিবকেল্লা কেন্দ্রে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০টার দিকে ভোট দেওয়া শেষ করে কেন্দ্রের বাইরে একটি ফাঁকা জায়গায় পুলিশের কাছাকাছি বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মোতালেব। ঠিক সেই মুহূর্তে কেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ কনস্টেবল ওহাব আলীর শটগান থেকে আকস্মিক গুলি বের হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেই গুলি মোতালেবের দুই পা ঝাঁঝরা করে দেয়। রক্তে ভেসে যায় কেন্দ্রের মাটি।
আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে আছেন মোতালেব। তাঁর দুই পা মোটা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। যন্ত্রণায় মাঝেমধ্যেই কুঁকড়ে উঠছেন তিনি। পাশে বসে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছেন স্ত্রী হালিমা খাতুন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভর্তির পর জরুরি ভিত্তিতে মোতালেবের পায়ে দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। হাড় ও মাংসপেশি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিনিয়র কনসালট্যান্টরা তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
মোতালেবের স্ত্রী হালিমা খাতুন কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে ইটিসি বাংলাকে বলেন, ‘‘আমার স্বামী কোনো মারামারি বা হাঙ্গামায় যাননি। তিনি শুধু ভোট দিতে গিয়েছিলেন। এখন তাঁর দুই পা অকেজো হয়ে গেছে। ডাক্তাররা ভরসা দিতে পারছেন না। আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। তিনি যদি আর হাঁটতে না পারেন, আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। সংসার চলবে কীভাবে, ছেলেমেয়ের মুখে ভাত দেব কেমনে?’’
ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে পুলিশের দায়িত্বশীলতা নিয়ে। একটি ভোটকেন্দ্রের মতো জনাকীর্ণ স্থানে লোডেড আগ্নেয়াস্ত্র পরিষ্কার করা বা নাড়াচাড়া করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে সমালোচনা চলছে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘‘স্থানীয়ভাবে জেনেছি, ওই পুলিশ সদস্য তাঁর বন্দুক পরিষ্কার বা নাড়াচাড়া করছিলেন। তখনই অসাবধানতাবশত গুলি বের হয়ে মোতালেবের পায়ে লাগে। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি চরম দায়িত্বহীনতা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’
সিরাজগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাজরান রউফ বলেন, ‘‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। গুলিবর্ষণের ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত কনস্টেবল ওহাব আলীকে পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে ওই কেন্দ্র থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে গুলিটি ভুলবশত বের হয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল।’’
ঘটনার তিন দিন পর গতকাল রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম হাসপাতালে ছুটে যান। তিনি আহত মোতালেবের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘দিনমজুর মোতালেবের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় জেলা প্রশাসন বহন করবে। এছাড়া তাঁর পরিবারের সচ্ছলতার জন্য আর্থিক সহযোগিতা এবং প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় গৃহনির্মাণে মানবিক সহায়তা প্রদান করা হবে।’’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও তিনি নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মোতালেবের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি সহায়তার আশ্বাস মিললেও মোতালেবের পরিবারের শঙ্কা কাটছে না। মোতালেব যদি পঙ্গুত্ব বরণ করেন, তবে সরকারি ঘর বা এককালীন অর্থ দিয়ে তাঁর সারাজীবনের আয়ের ঘাটতি পূরণ হবে না। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি তুলেছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে মোতালেবকে আজীবন আয়ের নিশ্চয়তা বা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সিরাজগঞ্জের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অস্ত্র থাকে জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য। সেই অস্ত্র যদি নিরীহ ভোটারের পঙ্গুত্বের কারণ হয়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে পুলিশের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।’’
হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে মোতালেব হয়তো ভাবছেন, তাঁর সেই একটি ভোট দেশে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখবে, কিন্তু সেই ভোটই তাঁর নিজের জীবনকে ঠেলে দিল এক অন্ধকারের দিকে। এখন শুধু অপেক্ষা—কবে শুকাবে ক্ষত, আর কবে বা মিলবে ন্যায়বিচার।
