কৃষক দলের নেতা জোর করে মাথা ন্যাড়া ও চোখের ভ্রু কেটে দেওয়ার অভিযোগ

ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এক ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক ঘটনার সাক্ষী হলো এলাকাবাসী। ভিন্ন প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর অভিযোগে নিজ দলেরই এক নেতাকে প্রকাশ্য দিবালোকে জোর করে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কেবল মাথা ন্যাড়াই নয়, তার চোখের ভ্রু কেটে দিয়ে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীর। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় কৃষক দলের এক শীর্ষ নেতা।

বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে গৌরীপুর পৌর শহরের জনাকীর্ণ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী নেতার নাম আব্দুল মান্নান তালুকদার। তিনি স্থানীয় বিএনপির একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম কাজিয়েল হাজাত শাহী মুন্সি, যিনি গৌরীপুর পৌর কৃষক দলের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর বয়ান অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ২টার দিকে আব্দুল মান্নান তালুকদার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে গৌরীপুর থেকে জেলা সদর ময়মনসিংহের দিকে যাচ্ছিলেন। দুপুর আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটের দিকে তাকে বহনকারী সিএনজিটি গৌরীপুর পৌরসভা সংলগ্ন ২ নম্বর রেলক্রসিং পার হয়ে নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন পৌর কৃষক দলের সভাপতি কাজিয়েল হাজাত শাহী মুন্সি ও তার অনুসারীরা।

রেলক্রসিংয়ের জ্যামে সিএনজিটি আটকা পড়লে শাহী মুন্সি দূর থেকে মান্নান তালুকদারকে দেখতে পান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দৌড়ে এসে সিএনজিটি থামান এবং মান্নান তালুকদারকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামান। এ সময় প্রকাশ্যে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে শাহী মুন্সি ও তার সহযোগীরা মান্নান তালুকদারকে মারধর করতে করতে রাস্তার পাশে থাকা একটি সেলুনে নিয়ে যান।

সেলুনের ভেতরে একটি চেয়ারে তাকে জোর করে বসিয়ে শাহী মুন্সির নির্দেশে নাপিতকে দিয়ে তার মাথার চুল সম্পূর্ণ কামিয়ে ফেলা হয়। অপমানের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে তার চোখের ভ্রুও কেটে দেওয়া হয়। জনসমক্ষে এমন পৈশাচিক আচরণের শিকার হয়ে মান্নান তালুকদার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

ঘটনার পর লজ্জায় ও ভয়ে আব্দুল মান্নান তালুকদার তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি কাউকে জানাননি। তিনি মুখ লুকিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। তবে পরে তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে পুরো বিষয়টি খুলে বলেন। বিকেলের দিকে তার ন্যাড়া মাথার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল মান্নান তালুকদার বলেন, “আমি বিগত ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। দলের জন্য জেল-জুলুম সহ্য করেছি, কিন্তু কখনো এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়নি। আমার অপরাধ হলো, আমি নির্বাচনে দলের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (ঘোড়া প্রতীক)-এর পক্ষে কাজ করেছি। কিন্তু নির্বাচনে তো ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন এবং তিনি বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিজয়ী দলের কর্মী হয়েও নিজ দলের নেতার কাছে এমন লাঞ্ছনা আমি মেনে নিতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন, “জনাকীর্ণ রাস্তায় আমাকে পশুর মতো ব্যবহার করা হয়েছে। আমি আশা করি, আমাদের প্রিয় নেতা ও প্রতিমন্ত্রী এবং সাধারণ জনগণ এই বর্বরোচিত ঘটনার বিচার করবেন।”

এদিকে, এত বড় অভিযোগ ওঠার পরেও বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত পৌর কৃষক দলের সভাপতি কাজিয়েল হাজাত শাহী মুন্সি। তিনি দাবি করেন, এটি তার বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বক্তব্যে শাহী মুন্সি বলেন, “আমি এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। মান্নান তালুকদাররা মূলত ষড়যন্ত্রকারী। তারা নির্বাচনে ঘোড়া মার্কার পক্ষে কাজ করে দলের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। এখন তাদের সেই অপকর্মের জন্য মানুষ যখন ছিঃ ছিঃ করছে, তখন তারা আমাদের ইমেজ নষ্ট করার জন্য নাটক সাজাচ্ছে। তাছাড়া তার মাথায় এমনিতেই চুল নেই। একটি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ করাই তাদের উদ্দেশ্য।”

ঘটনাটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ঘোড়া প্রতীকের আহাম্মদ তায়েবুর রহমান তার ফেসবুক পেজে মান্নান তালুকদারের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “এই বর্বরতার শেষ কোথায়?” তার এই স্ট্যাটাসের নিচে শত শত মানুষ অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের জেরে কারো ব্যক্তিগত সম্মানহানি করা সুস্থ রাজনীতির পরিচায়ক নয়। বিশেষ করে যখন দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তখন নিজ দলের কর্মীর ওপর এমন নির্যাতন দলের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে নড়েচড়ে বসেছে জেলা কৃষক দল। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা কৃষক দলের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবুল বাশার আকন্দ ইটিসি বাংলাকে বলেন, “ঘটনাটি আমিও শুনেছি এবং শোনার পরপরই আমি শাহী মুন্সিকে ফোন দিয়েছিলাম। সে ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করেছে। তবে আমরা বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছি না। বিষয়টি ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানানো হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী। তদন্ত সাপেক্ষে ঘটনার সত্যতা মিললে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো ব্যক্তির অপকর্মের দায় দল নেবে না।”

গৌরীপুরের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সহনশীলতা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ার কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করার এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। স্থানীয় জনগণ ও সচেতন মহল আশা করছে, প্রশাসন এবং দলীয় হাইকমান্ড এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অমানবিক কাজ করার সাহস না পায়। এখন দেখার বিষয়, প্রতিমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এই ঘটনায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন