মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, ঠিক তখনই এক নাটকীয় মোড় নিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। একদিকে পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে বসে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব—এমনই এক দ্বিমুখী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক।
ইরান রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত, যদি ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। শুধু তাই নয়, ইরান এমন একটি চুক্তির রূপরেখা প্রস্তাব করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক চাপ প্রয়োগের কৌশলও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের একজন প্রভাবশালী কূটনীতিক এবং তেহরানের একজন মন্ত্রী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইরান কেবল নিষেধাজ্ঞাই কাটাতে চায় না, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে এমন একটি টেকসই সম্পর্ক গড়তে চায় যা দুই পক্ষের জন্যই ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করবে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা ‘ফার্স’ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক কূটনীতি বিভাগের উপপরিচালক হামিদ ঘানবারির বরাত দিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ঘানবারি বলেন, ‘‘চুক্তি টেকসই করতে হলে এমন খাত রাখতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি লাভবান হবে এবং দ্রুত ও বেশি অর্থনৈতিক সুফল পাবে। আমরা চাই মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরানের তেল ও গ্যাসক্ষেত্র, খনি এবং এভিয়েশন সেক্টরে বিনিয়োগ করুক।’’
ঘানবারির মতে, ২০১৫ সালের বারাক ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ ছিল, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থকে যথেষ্ট সুরক্ষিত করতে পারেনি। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসে চুক্তি থেকে সরে যান, তখন মার্কিন অর্থনীতির ওপর তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এবার তেহরান চাইছে, মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরানে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলেই হুট করে চুক্তি বাতিল করতে পারবেন না। বিশেষ করে বোয়িং বা অন্য মার্কিন কোম্পানি থেকে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ক্রয়ের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইরানের এই নমনীয় প্রস্তাবের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ কঠোর। মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, আলোচনার গতি শ্লথ করে দিয়েছে ইরান নিজেই। তবে বিবিসি জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠকটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
আলোচনার আবহ বজায় থাকলেও পেন্টাগন হাত গুটিয়ে বসে নেই। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier) ওই অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা একে ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ বা শক্তি প্রদর্শনমূলক কূটনীতি হিসেবে অভিহিত করছেন।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা যদি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন বাহিনী দেশটিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পেন্টাগন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানো হচ্ছে এবং অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভায় এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio) ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে তিনি কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেন। তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও পরিষ্কার করেছেন যে, সব সমস্যার সমাধান টেবিলে নাও হতে পারে।’’
রুবিও আরও দাবি করেন, ‘‘তেহরানের সঙ্গে অতীতে কেউ সফল কোনো চুক্তি করতে পারেনি, কিন্তু আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি তারা ব্যর্থ হয়, তবে বিকল্প পথের জন্য আমরা প্রস্তুত।’’
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির খবরে তেহরানও বসে নেই। ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘ইরানের মাটিতে বা স্বার্থে যেকোনো ধরনের হামলাকে পুরোপুরি যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে। আমরা কেবল আত্মরক্ষাই করব না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু (Target) হবে।’’
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘বল এখন আমেরিকার কোর্টে। তারা চুক্তি চায় কি না, সেটা তাদেরই ঠিক করতে হবে। তারা যদি আন্তরিক হয় এবং হুমকি-ধমকির পথ পরিহার করে, তবে আমি নিশ্চিত আমরা একটি সমঝোতার দিকেই এগিয়ে যাব। কিন্তু বন্দুকের নলে রেখে কোনো আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে না।’’
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে যখন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন এবং তেহরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেন, তখন থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার যে কাঠামো ২০১৫ সালে তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ে।
এখন ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল। ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা (বিশেষ করে ইসরায়েল) কোনোভাবেই ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হতে দিতে চায় না।
চলতি মাসের শুরুতে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাকে বিশ্লেষকরা ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের দিকে পা বাড়ায়, তবে তা কেবল ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার বৈঠকই নির্ধারণ করবে—ভবিষ্যৎ কি শান্তির পথে হাঁটবে, নাকি সংঘাতের দাবানলে পুড়বে। হামিদ ঘানবারির প্রস্তাবিত ‘অর্থনৈতিক সুফল’ বাণিজ্যের টোপ ট্রাম্প প্রশাসনকে কতটা আকৃষ্ট করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে আপাতত পারস্য উপসাগরের জলসীমায় উত্তেজনা চরমে, যেখানে ভাসছে মার্কিন রণতরী আর তার দিকে তাক করা আছে ইরানি মিসাইল।
