দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে অন্তর্বর্তী সরকার, সোম বা মঙ্গলবার সিইসির অধীনেই হতে পারে এমপিদের শপথ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সফল সমাপ্তির পর এবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার ওপর। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কালবিলম্ব না করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সাংবিধানিক জটিলতা ও বিদ্যমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই, অর্থাৎ সোম বা মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র ও নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জাতীয় সংসদের স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এবার শপথ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করতে পারেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। একই দিনে বা তার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ নেওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর দায়িত্ব বিদায়ী স্পিকারের। বর্তমানে এই পদে কাগজে-কলমে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী থাকলেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি এবং তার পদত্যাগ ও আত্মগোপন নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। এমতাবস্থায় তাকে দিয়ে শপথ পড়ানো বাস্তবে অসম্ভব।

অন্যদিকে, বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা মামলায় বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। ফলে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার—উভয়ের অনুপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে এক ধরণের সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকার শপথ পড়াতে ব্যর্থ হলে বা অপারগ হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। আর দুজনেই অনুপস্থিত থাকলে স্পিকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পড়াতে পারেন। সংবিধানের এই বিধানকে কাজে লাগিয়েই সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনের মাধ্যমে শপথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারের শপথ না পড়ানো পর্যন্ত তিন দিন অপেক্ষা করার বিধান রয়েছে। এরপর সিইসি দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট যেহেতু ভিন্ন এবং এটি একটি বিশেষ পরিস্থিতির নির্বাচন, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সময়সীমা শিথিল করে দ্রুততম সময়ে শপথ আয়োজনের চিন্তাভাবনা চলছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সাধারণত তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ফলাফল মোটামুটি স্পষ্ট। আজ বা কালের মধ্যে গেজেট প্রকাশিত হলে, আগামী সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বা মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হবে।

জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে এই আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য ইতিমধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সংসদ সচিবালয় থেকেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, এবারের শপথের বিষয়টি শুধু সাংবিধানিক প্রক্রিয়াগত নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরও নির্ভরশীল। যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাদের মেয়াদ শেষ করতে চায়, তাই দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সিইসির মাধ্যমে শপথ পড়ানোই এখন একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।

প্রায় দেড় বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ–অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দীর্ঘ সংস্কার কার্যক্রম ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে দুটি আসনের গেজেট প্রকাশ আপাতত স্থগিত রয়েছে।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দলটি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে এবং তাদের মিত্ররা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা পেয়েছে ৯টি আসন।

এই ফলাফলের মাধ্যমে সংসদে বিএনপির একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলেও, জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসা সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকসহ বিশিষ্ট আইনজীবীরা মনে করছেন, সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, এবারের নির্বাচন হয়েছে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার নীতি এবং বিপ্লব পরবর্তী বিশেষ প্রেক্ষাপটে। তাই শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রেও কঠোর আক্ষরিক ব্যাখ্যার চেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানই কাম্য।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যেহেতু দেশে কোনো কার্যকর স্পিকার নেই এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে, তাই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের শপথ পড়ানো নিয়ে আইনগত কোনো বড় বাধা নেই। বরং এটি ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। রাজনৈতিক দলগুলোও, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, দ্রুত সরকার গঠন ও সংসদ চালু করার পক্ষে মত দিয়েছে।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের পরপরই সংসদ নেতা নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার শপথও দ্রুতই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

জনগণ এখন তাকিয়ে আছে আগামীর সংসদ ও সরকারের দিকে। দীর্ঘ দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে—এটিই এখন দেশের মানুষের স্বস্তির খবর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন