মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পারমাণবিক ইস্যুতে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ব্যর্থ আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি মন্তব্য করেছেন যে, ইরানে সরকার পতন বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনই হবে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ‘সবচেয়ে আদর্শ ঘটনা’।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন, যা এই অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের তিক্ত ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “৪৭ বছর ধরে তারা (ইরান) শুধু আলোচনা করছে, কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”
ইরানের সঙ্গে গত প্রায় পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্ককে তিনি ‘নিষ্ফল’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, “তাদের আলোচনার মধ্যেই আমরা অনেককে হারিয়েছি। আমাদের সৈন্যদের ওপর হামলা হয়েছে। কারও পা উড়ে গেছে, হাত উড়ে গেছে, মুখ উড়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা শুধু সময়ক্ষেপণ করেছে, কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি।”
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি আর আলোচনার টেবিলে সময় নষ্ট করতে রাজি নন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানে যদি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তবে সেটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এবং সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান।
ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তির সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উত্তর দেন। তিনি বলেন, “তারা যদি সঠিক চুক্তি করত, তবে আমরা কোনো কঠোর পদক্ষেপ (হামলা) নিতাম না। আমি যদি একবার চুক্তিটি করতে পারি, তাহলে এটা সবার জন্যই ভালো হবে।”
তবে তিনি নিজেই সেই সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি যোগ করেন, “ঐতিহাসিকভাবে তারা তা করেনি। তারা কথা বলতে চায়, কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক কথা বলে তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”
ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী বক্তব্য—একদিকে চুক্তির আহ্বান এবং অন্যদিকে সরকার পরিবর্তনের ডাক—ইরান নীতির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।
ইরানে যদি সত্যি সত্যি সরকার পতন হয় বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তবে দেশটির দায়িত্ব কে নেবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আমি এ নিয়ে এখনই কথা বলতে চাই না। তবে এর জন্য মানুষ আছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অস্পষ্ট উত্তর ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন হয়তো ইরানের বিরোধী কোনো গোষ্ঠী বা নির্বাসিত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, অথবা দেশটির অভ্যন্তরে কোনো পরিবর্তনের ছক কষছে। তবে বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
কূটনৈতিক হুঙ্কারের পাশাপাশি সামরিক শক্তি প্রদর্শনেও পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier) পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
শুক্রবার তিনি নিশ্চিত করেন যে, দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরীটি খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছাবে। এটি আগে থেকেই আরব সাগরে অবস্থানরত ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ রণতরীর সঙ্গে যুক্ত হবে। দুটি শক্তিশালী মার্কিন রণতরী বা ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ একই অঞ্চলে অবস্থান করার অর্থ হলো—যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে অথবা ইরানকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ একাই একটি দেশের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। সেখানে দুটি গ্রুপের উপস্থিতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের মেঘ আরও ঘনীভূত করেছে।
সম্প্রতি ওমান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছিল। উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা কমানো এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় রণতরী পাঠানোর ঘোষণা প্রমাণ করে যে, সেই আলোচনা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসতে নারাজ, আর যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধ শিথিল করতে রাজি নয়। এই অনড় অবস্থানের কারণেই আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে সংঘাতের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণার পর তেহরানও চুপ করে বসে নেই। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
ইরানি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তবে আমরা যুদ্ধ চাই না। কিন্তু আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আসলে আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করব।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই মুখোমুখি অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি এবং তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলে যুদ্ধ বাঁধলে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে, যার ফলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘সরকার পতনের’ ডাক এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘোষণা আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। ২০২৬ সালের শুরুতেই এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।
