চাঁপাইনবাবগঞ্জে ককটেল তৈরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, ২ জন নিহত, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৩

ভোরের আলো ফোটার আগেই বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো গ্রাম। ঘুমের মধ্যেই আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন গ্রামবাসী। ধুলো আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখে তারা বুঝতে পারেন, বড় কোনো অঘটন ঘটেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির ইটের দেয়াল ধসে পড়েছে, টিনের চাল উড়ে গেছে বহু দূরে। আর সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল আর্তনাদ।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৫টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের পাঠাপাড়া গ্রামে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি বসতবাড়িতে গোপনে ককটেল বা হাতবোমা তৈরির সময় এই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুইজন নিহত হয়েছেন এবং তিনজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটেছে পাঠাপাড়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের বাড়িতে। শনিবার ভোররাতে যখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন কালামের বাড়িতে গোপনে ককটেল তৈরির কাজ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য মজুদ করা হয়েছিল সেখানে। অসাবধানতাবশত বা রাসায়নিক সংমিশ্রণের ভুলে হঠাৎ করেই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কালামের একতলা পাকা বাড়ির একাংশ সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ঘরের ইটের দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং টিনের চাল উড়ে গিয়ে পাশের জমিতে পড়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে কয়েক কিলোমিটার দূরের মানুষও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “ফজরের নামাজের জন্য ওজু করতে উঠেছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে দেখি কালামের বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভেতরে কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি।”

বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই দুইজন নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ফলে নিহতদের শরীর এতটাই ক্ষতবিক্ষত ও মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে যে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল বলে উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও সিআইডি’র ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও তিনজন। তারা হলেন—সদর উপজেলার পাঠাপাড়া গ্রামের মিনহাজ (৫২), একই গ্রামের বজলুর রহমান (২০) এবং রানীহাটির ধুমী গ্রামের মো. শুভ (২০)।

স্থানীয়রা আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, আহতদের শরীরের সিংহভাগ দগ্ধ হয়েছে এবং স্প্লিন্টারের আঘাতে তারা গুরুতর জখম হয়েছেন। তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের অবস্থাও অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “ভোর ৫টার দিকে আমরা বিস্ফোরণের খবর পাই। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, ওই বাড়িতে ককটেল বা দেশি বোমা তৈরি করা হচ্ছিল। বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়েছেন, যাদের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। আহত তিনজনকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়েছে।”

ওসি আরও জানান, বিস্ফোরণের পর ওই বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখানে আরও কোনো অবিস্ফোরিত ককটেল বা বিস্ফোরক দ্রব্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে। বাড়ির মালিক মো. কালাম পলাতক রয়েছেন কি না, বা তিনি হতাহতদের মধ্যে আছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নটি সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে প্রায়শই চোরাচালান ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। ককটেল বিস্ফোরণের এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর টহল জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে, তবে থমথমে ভাব কাটেনি।

স্থানীয়দের ধারণা, আসন্ন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই ককটেলগুলো তৈরি করা হচ্ছিল। সীমান্তবর্তী এই জনপদে বিভিন্ন সময় মাদক ও চোরাচালানের সিন্ডিকেটগুলো নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “এই এলাকায় মাঝেমধ্যেই এমন বোমাবাজির শব্দ শোনা যায়। কিন্তু আজকের ঘটনাটি ছিল নজিরবিহীন। যারা এই কাজ করছিল, তারা হয়তো বড় কোনো নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।”

পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে এই ককটেলগুলো ঠিক কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছিল। তবে এর পেছনে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় সদর থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

বর্তমানে ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আলামত সংগ্রহের কাজ চলছে। এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অবৈধ বিস্ফোরকের ব্যবহার ও মজুত গ্রামীণ জনপদে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন