নির্বাচনী প্রচারণার মাঠ এখন শান্ত। মাইকের শব্দ আর মিছিলে মুখর জনপদ বড়লেখা ও জুড়ীতে বিরাজ করছে পিনপতন নীরবতা। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে চলছে ভোটের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ। মৌলভীবাজার-১ আসনে ধানের শীষের নাসির উদ্দিন আহমেদ এবং দাঁড়িপাল্লার মাওলানা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের মধ্যে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে সব সমীকরণ ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী ‘ভোটব্যাংক’ শেষ পর্যন্ত কার ঝুড়িতে পড়বে? কারণ, এই বিশাল রিজার্ভ ভোটই এবারের নির্বাচনে জয়ের প্রকৃত ‘ট্রাম্পকার্ড’।
মৌলভীবাজার-১ আসনটি দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর থেকে আটবার এ আসনে নৌকার প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল লড়াইয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় আলোচনায় না থাকায় তাদের বিশাল ভোটারগোষ্ঠী এখন সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে। বড়লেখা ও জুড়ীর ১০টি এবং ৬টি ইউনিয়ন মিলিয়ে এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৬ জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই হলো আওয়ামী লীগের আদর্শিক ভোটার।
এই আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং চা শ্রমিকদের ভোট সবসময়ই নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
- সংখ্যালঘু ভোটার: প্রায় ৮০ হাজার।
- আওয়ামী লীগের অনুগত ও চা শ্রমিক ভোট: আরও প্রায় ৬০ হাজার। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ভোটের একটি বিশাল অংশ ঐতিহাসিকভাবে নৌকার অনুসারী। যেহেতু এবার সরাসরি নৌকার আধিপত্য নেই, তাই এই ভোটগুলো বিএনপি না কি জামায়াত—কাকে বেছে নেবে, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
নির্বাচনী মাঠে পাঁচজন প্রার্থী থাকলেও লড়াই মূলত দ্বিমুখী।
- নাসির উদ্দিন আহমেদ (বিএনপি – ধানের শীষ): বিএনপির নিজস্ব ভোটারদের পাশাপাশি তিনি সাধারণ ও নিরপেক্ষ ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নীরব ভোটারদের বড় অংশ ধানের শীষে ভোট দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- মাওলানা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (জামায়াত – দাঁড়িপাল্লা): জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভোটব্যাংক তার বড় শক্তি। নীরব প্রচারণায় তিনি সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের আশ্বাস দিচ্ছেন।
এছাড়া জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন (লাঙ্গল) এবং আল ইসলাহ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মুফতি বেলাল আহমদ (কাপ পিরিচ) লড়াইয়ে থাকলেও তারা মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য ভোট কাটার কারণ হতে পারেন।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোটাররা যদি শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে যান, তবে তারা কৌশলগত কারণে বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারেন। আবার জামায়াতের পক্ষ থেকেও সংখ্যালঘু ভোটারদের অভয় দিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা চলছে।
বড়লেখা ও জুড়ীর সচেতন ভোটাররা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সেই ১ লাখ ৪০ হাজার ভোট যে প্রার্থীর পক্ষে বেশি পড়বে, তিনিই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বিজয়ের মালা পরবেন।
