সোমালিয়া-সৌদি আরবের চুক্তিতে ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড়

বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলে যখন উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতি বিরাজ করছে, ঠিক তখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপে হাত বাড়ালো সোমালিয়া ও সৌদি আরব। গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) দেশ দুটির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক প্রদর্শনীর ফাঁকে সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়াল্লিম ফিকি এবং সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এই চুক্তিতে সই করেন।

এই চুক্তি এমন এক সময়ে হলো যখন সোমালিয়া তার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং সৌদি আরব লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া। বিশেষ করে, সম্প্রতি ইসরায়েল কর্তৃক বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ‘সোমালিল্যান্ড’কে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনার মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই চুক্তি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সোমালিয়া ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। এটি একদিকে ভারত মহাসাগর এবং অন্যদিকে সুয়েজ খালের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্র বাণিজ্যপথগুলোর একটি। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজের বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলটি জলদস্যুতা এবং আল-শাবাবের মতো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে থাকলেও, বর্তমান সময়ে এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য সোমালিয়ার সাথে এই মিত্রতা অত্যন্ত জরুরি। তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের জন্য লোহিত সাগরের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। অন্যদিকে, সোমালিয়া দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে এখন নিজের সামরিক বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে চাচ্ছে।

এই প্রতিরক্ষা চুক্তির একটি প্রচ্ছন্ন দিক হলো সোমালিল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক তৎপরতা। ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও আন্তর্জাতিকভাবে সোমালিল্যান্ড দীর্ঘকাল স্বীকৃতির অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু গত দেড় মাস আগে ইসরায়েল কর্তৃক সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনা মোগাদিশু (সোমালিয়ার রাজধানী) সরকারকে বেশ নাড়া দিয়েছে।

সোমালিয়া ঐতিহাসিকভাবে দাবি করে আসছে যে সোমালিল্যান্ড তাদেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে মোগাদিশু তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। এমতাবস্থায়, সৌদি আরবের মতো একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করাকে সোমালিয়ার পক্ষ থেকে একটি শক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। রিয়াদও পরোক্ষভাবে সোমালিয়ার একক সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের সমর্থন পুর্নব্যক্ত করল এই চুক্তির মাধ্যমে।


রিয়াদে অনুষ্ঠিত সামরিক প্রদর্শনীতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির খুঁটিনাটি বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে সোমালিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো:

  • সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং যৌথ মহড়া।
  • প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি: সোমালিয়ার সেনাদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান।
  • নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় যৌথ কার্যক্রম।

সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন যে, এই চুক্তিগুলো দুই দেশের সাধারণ স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক এবং সৌদি আরব—প্রত্যেকেই হর্ন অব আফ্রিকা বা আফ্রিকার শিং অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সচেষ্ট। বিশেষ করে ইথিওপিয়া ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যকার সাম্প্রতিক বন্দর চুক্তির পর সোমালিয়া বেশ চাপের মুখে পড়েছিল। সৌদি আরবের সাথে এই নতুন প্রতিরক্ষা জোট সোমালিয়াকে সেই চাপ মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব চায় না এই কৌশলগত সমুদ্রপথে কোনো অস্থিতিশীলতা থাকুক যা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিপন্থী। সোমালিয়ার শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করার মাধ্যমে রিয়াদ মূলত নিজের পিছন দিকের নিরাপত্তা (Backyard Security) নিশ্চিত করছে।


সোমালিয়া-সৌদি আরবের এই জোট আফ্রিকার শিং অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে দিতে পারে। বিশেষ করে মোগাদিশু এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের দাবি উত্থাপন করতে পারবে। সৌদি আরবের বিনিয়োগ ও সামরিক ছায়া সোমালিয়াকে অর্থনৈতিকভাবেও চাঙা করার সম্ভাবনা রাখে।

তবে এটিও লক্ষ্যণীয় যে, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি উপস্থিতির সম্ভাবনা এবং তার বিপরীতে সৌদি-সোমালিয়া চুক্তি ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে কোনো প্রক্সি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। আপাতত, মোগাদিশু ও রিয়াদ—উভয় পক্ষই এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক এবং গঠনমূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।


সোমালিয়া ও সৌদি আরবের এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি সামরিক দলিল নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা। এটি একদিকে যেমন সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করে, অন্যদিকে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের কর্তৃত্ববাদী অবস্থানকে আরও সংহত করে। সামনের দিনগুলোতে এই জোট আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার অপেক্ষায় সারা বিশ্ব।

ইটিসি বাংলা সংবাদমাধ্যম সবসময় খবরের গভীরে গিয়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয় আপনার কাছে। দেশ-বিদেশের আরও খবর পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন