ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় মোবাইল নিষেধাজ্ঞা, জামায়াত আমিরের কঠোর হুঁশিয়ারি

দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক উত্তাপ এখন তুঙ্গে। একদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সুষ্ঠু ও নিরাপদ ভোটগ্রহণের স্বার্থে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করছে। এই টানটান উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটের অধিকার একবার লড়াই করে অর্জিত হয়েছে, প্রয়োজনে সেই অধিকার রক্ষায় আবারও লড়াই করতে প্রস্তুত জাতি।

অন্যদিকে, ঠিক এর আগের দিন অর্থাৎ রবিবার রাতে নির্বাচন কমিশন ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় এক বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যেখানে সাধারণ ভোটারদের মোবাইল ফোন নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আমিরের ‘গণতন্ত্রের উৎসবে ছবি তোলা’র আহ্বান এবং ইসির ‘মোবাইল নিষিদ্ধ’ করার প্রজ্ঞাপন—এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থান নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মাঝে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তার দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের মানুষ একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ভয়হীন নির্বাচন চায়। এই অধিকার কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের দান নয়, বরং বহু ত্যাগের বিনিময়ে, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে।

পোস্টে তিনি লিখেন, “এ দেশের মানুষ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। রক্তের বিনিময়ে এই অধিকার অর্জিত হয়েছে। মানুষ নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দিতে চায়, প্রার্থী ও প্রতীক নিয়ে উদ্যাপন করতে চায়।”

জামায়াত আমির নির্বাচনকে কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে একে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিনটি হওয়া উচিত উৎসব উদ্যাপনের দিন, যেখানে কোনো ভয়ভীতি থাকবে না। ভোটাররা গর্বভরে লাইনে দাঁড়াবেন, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন এবং সেই মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখতে ছবি তুলবেন বা স্বাধীনতা উপভোগ করবেন।

তবে তার এই বক্তব্যের পরই আসে কঠোর হুঁশিয়ারি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, কোনো মহল যদি এই উৎসবে বাধা দেয় বা ভোটাধিকার হরণে লিপ্ত হয়, তবে জনগণ তা মেনে নেবে না। তিনি লেখেন, “এর ব্যত্যয় ঘটার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি এই অধিকার কেড়ে নিতে চায় বা এতে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে, তার মনে রাখা উচিত, এই জাতি প্রস্তুত। বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম অধিকার রক্ষায় সদা প্রস্তুত আছে।”

পোস্টের শেষাংশে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, “ভোটের অধিকার একবার লড়াই করে অর্জিত হয়েছে। প্রয়োজনে এই অধিকার আবারও লড়াই করেই রক্ষা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।”

ডা. শফিকুর রহমান যখন ভোটারদের ছবি তোলা ও উৎসবের আমেজ উপভোগ করার কথা বলছেন, ঠিক তার আগের রাতে নির্বাচন কমিশন থেকে আসা নির্দেশনাটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। রবিবার রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলামের সই করা চিঠিতে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সাথে চলমান গণভোট উপলক্ষে জারি করা এই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ (চারশত) গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন বহন করতে পারবেন না।

ইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল নিম্নবর্ণিত ব্যক্তিরাই মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন:
১. ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার।
২. ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ইনচার্জ।
৩. ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত অঙ্গীভূত আনসার, সাধারণ আনসার বা ভিডিপি সদস্য—তবে শর্ত হলো, তাদের মধ্যে মাত্র ০২ (দুই) জন সদস্য মোবাইল রাখতে পারবেন যারা ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ (Election Security 2026) নামক বিশেষ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারকারী।

এই নির্দেশনার বাইরে কোনো ভোটার, পোলিং এজেন্ট বা অন্য কোনো ব্যক্তি মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। ইতোমধ্যেই এই চিঠি বিভাগীয় কমিশনার, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, সব জেলা প্রশাসক এবং রিটার্নিং অফিসারদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং নির্দেশনাটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জামায়াত আমিরের বক্তব্য এবং ইসির প্রজ্ঞাপন—এই দুইয়ের মধ্যে এক ধরনের কৌশলগত দ্বান্দ্বিক অবস্থান লক্ষ্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ডা. শফিকুর রহমান তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন যে, ভোটাররা “গর্বভরে ভোটার লাইনে দাঁড়াবেন, ছবি তুলবেন”। কিন্তু ইসির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোনই নিষিদ্ধ। এমতাবস্থায় ভোটাররা কীভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনেকে মনে করছেন, ইসির এই সিদ্ধান্ত মূলত ভোটকেন্দ্রের ভেতর ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট করা রোধ করার জন্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী আনসার সদস্যদের হাতে ফোন রাখার অনুমতি দেওয়ায় বোঝা যায়, ইসি প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর ওপর নজরদারি করতে চাইছে, কিন্তু সাধারণের হাতে সেই নিয়ন্ত্রণ দিতে নারাজ।

অন্যদিকে, জামায়াত আমিরের ‘তরুণ প্রজন্মের প্রস্তুত থাকা’ এবং ‘লড়াইয়ের’ হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দেয় যে, মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার অজুহাতে বা অন্য কোনো উপায়ে যদি ভোটারদের বাধা দেওয়া হয় বা স্বচ্ছতায় বিঘ্ন ঘটে, তবে রাজপথে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচনের ভোট নয়, এর পাশাপাশি ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের রায় নেবে।

নির্বাচন কমিশন তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ব্যালট পেপার, বাক্স এবং নির্বাচনী সরঞ্জাম জেলায় জেলায় পৌঁছে গেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার, বিজিবি এবং সেনা মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এত প্রস্তুতির মাঝেও ডা. শফিকুর রহমানের “প্রয়োজনে আবারও লড়াই” করার ঘোষণা প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।

ভোটাররা আশা করছেন, ইসির মোবাইল সংক্রান্ত কড়াকড়ি যেন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ না হয় এবং জামায়াত আমিরের আশঙ্কা যেন বাস্তবে রূপ না নেয়। একটি উৎসবমুখর, সংঘাতহীন এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশায় এখন প্রহর গুনছে পুরো জাতি। ১২ তারিখের সূর্যদয়ই বলে দেবে, বাংলাদেশ তার গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় কতটা সফল হতে পারল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন