বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন এবং আবেগের নাম ভারত-বনাম পাকিস্তান দ্বৈরথ। সীমানার কাঁটাতার পেরিয়ে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ক্রিকেটীয় লড়াই সব সময়ই জন্ম দেয় নতুন নতুন গল্পের। তবে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আবহে এই ম্যাচ ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা। সব শঙ্কা, অনিশ্চয়তা আর কূটনৈতিক টানাপড়েন শেষে অবশেষে ২২ গজের লড়াইয়ে নামছে এশিয়ার দুই পরাশক্তি।
আগামীকাল রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি), শ্রীলঙ্কার কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এই ‘হাইভোল্টেজ’ ম্যাচ। ম্যাচটি ঘিরে ক্রিকেটবিশ্বে বইছে তীব্র উত্তেজনা। কলম্বোর বাতাস এখন ভারী হয়ে আছে ক্রিকেটপ্রেমীদের উন্মাদনায়, আর টিকিটের হাহাকারে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন হাজারো সমর্থক।
এবারের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই নানামুখী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা এই ম্যাচটিকে ঘিরে ধরেছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক এবং তাকে ‘অন্যায়’ দাবি করে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে ম্যাচ বয়কটের হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল ঘোলাটে।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতি এবার বেশি উত্তাপ ছড়িয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক টেবিলে সব সমস্যার সমাধান হয়েছে। আর এই নাটকীয়তা ম্যাচটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে যাওয়ায় এখন সবার নজর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের দিকে।
কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু এই ৩৫ হাজার আসন যেন সমুদ্রের বুকে এক বিন্দু জল। টিকিট ছাড়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনলাইন এবং অফলাইন কাউন্টার থেকে সব টিকিট ‘সোল্ড-আউট’ হয়ে যায়। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অফিশিয়াল টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন ভরসা কেবল কালোবাজার। সেখানে টিকিটের দাম চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হাঁকা হচ্ছে। তবুও ক্রিকেটপাগল দর্শকরা যেকোনো মূল্যে মাঠে বসে এই ঐতিহাসিক লড়াই দেখার জন্য মরিয়া।
ক্রিকেট বোদ্ধাদের ধারণা, আগামীকাল রবিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচটি টেলিভিশন ভিউয়ারশিপের সব অতীত রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ উপভোগ করে।
আইসিসির পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখা ম্যাচটি ছিল ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল (ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা), যা ৫৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ সরাসরি দেখেছিল। এছাড়া একই আসরের সেমিফাইনালে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি দেখেছিল ৪৯ কোটি ৫০ লাখ দর্শক। এবারের ম্যাচের আগে যে পরিমাণ হাইপ তৈরি হয়েছে, তাতে মনে করা হচ্ছে এই সংখ্যাগুলো এবার ম্লান হয়ে যাবে।
গ্রুপ পর্বের এই মহারণ দেখতে কলম্বোয় ভিড় জমিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রিকেটপ্রেমীরা। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত থেকে হাজার হাজার দর্শক এখন শ্রীলঙ্কায় অবস্থান করছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, এই বিপুল জনসমাগমের ফলে কলম্বোর পর্যটন ও পরিবহন খাতে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা।
কলম্বোর হোটেলগুলোতে এখন ঠাঁই নেই অবস্থা। চাহিদার তুঙ্গে থাকায় হোটেল মালিকরা ভাড়ার পরিমাণ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন অনলাইন বুকিং সাইটের তথ্য অনুযায়ী, কলম্বোতে সাধারণত এক রাতের জন্য হোটেলের ভাড়া যেখানে ১০০ থেকে ১৫০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ হাজার ৩৪৬ টাকা) থাকে, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৬৬০ ডলারে (প্রায় ৮০ হাজার ৭২২ টাকা)।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রেও। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিশ্চিত হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে চেন্নাই ও দিল্লি থেকে কলম্বোগামী ফ্লাইটের বুকিং জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ভারতের চেন্নাই থেকে কলম্বো যেতে সময় লাগে মাত্র দেড় ঘণ্টার মতো। কিন্তু এইটুকু পথের বিমান ভাড়াও এখন আকাশচুম্বী। চেন্নাই-কলম্বো রুটের ভাড়া ৬২৩ ডলার থেকে বেড়ে ৭৫৬ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে দিল্লি থেকে বিমান ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬৬ ডলারে।
শ্রীলঙ্কা ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরসের সভাপতি নালিন জয়াসুন্দেরা জানান, “বেশিরভাগ সমর্থক ‘অল-ইনক্লুসিভ’ প্যাকেজে শ্রীলঙ্কায় আসছেন, যার মূল্য ১৫০০ থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত। টিকিট, হোটেল এবং ফ্লাইটের দুষ্প্রাপ্যতায় খরচ আরও বাড়ছে।”
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কার জন্য এই ম্যাচটি যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। শ্রীলঙ্কা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বুদ্ধিকা হেওয়াসাম রয়টার্সকে জানান, গত ১০ দিনে শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১ লাখ পর্যটক প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ পর্যটক এসেছেন শুধুমাত্র ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে কেন্দ্র করে।
তিনি আরও বলেন, “এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় যে, শ্রীলঙ্কা নিরপেক্ষ ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে বড় ইভেন্ট আয়োজনে সম্পূর্ণ সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী। দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশ—হোক সেটা ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ—সবার জন্যই শ্রীলঙ্কা একটি নিরাপদ ও উৎসবমুখর গন্তব্য।”
মাঠের বাইরের উত্তাপ ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুই দলের পারফরম্যান্স। ‘এ’ গ্রুপে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দলই এখন পর্যন্ত অপরাজিত। দুটি করে ম্যাচ জিতে তারা ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। রবিবারের ম্যাচে জয়ী দল সরাসরি ‘সুপার এইট’ নিশ্চিত করবে, যা ম্যাচের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হবে এই দ্বৈরথ। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ রয়েছে প্রায় ১৩ বছর ধরে। আর টেস্ট ম্যাচ হয়নি ১৮ বছরেরও বেশি সময়। তাই আইসিসি বা এসিসি আয়োজিত টুর্নামেন্টগুলোই এখন সমর্থকদের একমাত্র ভরসা। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে এই দুই দলের লড়াই দেখার জন্য তাই বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় ক্রিকেট বিশ্বকে। কাল কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে জ্বলে উঠবে ফ্লাডলাইট, আর সেই আলোয় নির্ধারিত হবে এশীয় ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কে এগিয়ে থাকে—রোহিত শর্মার ভারত নাকি বাবর আজমের পাকিস্তান। উত্তেজনার বারুদ ঠাসা এই ম্যাচের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
