বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদানের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ভোট প্রদানের হার অত্যন্ত সন্তোষজনক হলেও, প্রক্রিয়াগত ভুলের কারণে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ভোট বাতিল বলে গণ্য হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসি সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে মোট ভোট পড়ার হার ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে স্ক্রুটিনি বা যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ভোটের হার দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ, বিপুল উৎসাহ নিয়ে ভোট দিলেও নিয়ম না মানা এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেক নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগ সফল হয়নি।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ (Postal Vote BD) নামক একটি বিশেষ অ্যাপ চালু করা হয়েছিল। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার কারণে দেশে এবং প্রবাসে অবস্থানরত ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের জন্য সর্বমোট ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশই ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশি। জীবিকার তাগিদে বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন প্রবাসী এই অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেন। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে জরুরি সেবায় নিয়োজিত সরকারি চাকরিজীবী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং কারাগারে থাকা কয়েদিদের মধ্য থেকে নিবন্ধন করেন ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন।
প্রযুক্তিগত এই উদ্যোগের ফলে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজতর হওয়ায় নিবন্ধনের এই বিপুল সংখ্যাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, নিবন্ধিত ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জনের মধ্যে মোট ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন। শতাংশের হিসেবে যা মোট নিবন্ধনের ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ। এটি নির্দেশ করে যে, পোস্টাল ভোটের বিষয়ে নাগরিকদের আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না।
ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রবাসী ও দেশি ভোটারদের মধ্যে একটি তুলনামূলক চিত্রও উঠে এসেছে। নিবন্ধিতদের মধ্যে প্রবাস থেকে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭২ জন। অন্যদিকে, দেশের ভেতর থেকে ভোট দিয়েছেন ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৬ জন।
তবে ভোট দিলেই তা সরাসরি গণনায় আসে না; তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছাতে হয়। ইসি জানায়, প্রবাস থেকে পাঠানো ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২০৪টি এবং দেশের ভেতর থেকে পাঠানো ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮৮টি ব্যালট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২টি ভোট গ্রহণ করেছেন, যা মোট নিবন্ধনের ৭৬ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ভোট প্রদান করা (১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮) এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে পৌঁছানো (১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২) ভোটের মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার ৫৯৬টি ভোটের ব্যবধান রয়েছে। ডাকবিভাগের বিলম্ব বা সঠিক সময়ে ডাকে না দেওয়ার কারণে এই ভোটগুলো গণনার আগেই বাদ পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটের বাতিল হওয়ার হার। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছানো ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২টি ব্যালটের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ বলে গণ্য হয়েছে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি ভোট। অর্থাৎ, প্রায় ৯২ হাজার ৯৫টি ভোট রিটার্নিং কর্মকর্তার টেবিলে পৌঁছানোর পরেও বাতিল হয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পোস্টাল ব্যালট বাতিলের পেছনে মূলত প্রক্রিয়াগত ভুলই দায়ী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো:
১. ব্যালট পেপারে সঠিক স্থানে স্বাক্ষর না থাকা বা স্বাক্ষর গরমিল।
২. নির্ধারিত খামের পরিবর্তে অন্য খাম ব্যবহার করা।
৩. সহায়ক নথিপত্র (যেমন- পরিচয়পত্রের অনুলিপি) সংযুক্ত না করা।
৪. ব্যালট পেপার ভাঁজ করার নিয়মে ভুল করা।
৫. অ্যাপের নির্দেশাবলী সঠিকভাবে অনুসরণ না করা।
কর্মকর্তারা বলছেন, “নিয়মানুযায়ী না করায় ভোটগুলো বাতিল করা হয়েছে। পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ইসি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে। সামান্যতম ত্রুটি থাকলেও সেই ভোট গণনা করা সম্ভব হয়নি।”
সকল যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে বৈধ ভোটের হার দাঁড়িয়েছে মোট নিবন্ধনের ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশ। সংখ্যার হিসেবে যা ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি।
এর মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো বৈধ ভোটের সংখ্যা ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৭৩টি। আর দেশের ভেতর থেকে সরকারি চাকরিজীবী ও অন্যান্যদের পাঠানো বৈধ ভোটের সংখ্যা ৬ লাখ ১ হাজার ৫২৪টি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের ভেতরের ভোটারদের তুলনায় প্রবাসীদের ভোট বাতিলের হার এবং ভোট না পৌঁছানোর হার কিছুটা বেশি। ডাক ব্যবস্থার জটিলতা এবং দূরত্বের কারণে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে, কারণ এর সঙ্গে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার বিষয়ে জনগণের মতামত নিতেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। পোস্টাল ব্যালটের এই পরিসংখ্যান সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট—উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দীর্ঘ দিন ধরে জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের मताধিকার প্রয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে সেই সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছিল লক্ষণীয়। তবে বাতিলের উচ্চ হার ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্বাচনে ভোটারদের জন্য আরও ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং নির্দেশিকা প্রচারের প্রয়োজন রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইটিসি বাংলাকে বলেন, “৮০ শতাংশের বেশি ভোট কাস্টিং হওয়াটা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। তবে বৈধ ভোটের হার ৭০ শতাংশে নেমে আসাটা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। ভবিষ্যতে পোস্টাল ব্যালটের নিয়মাবলী আরও সহজ করা এবং ভোটারদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করব। তবুও, ১০ লক্ষাধিক মানুষ সশরীরে উপস্থিত না হয়েও ভোট দিতে পেরেছেন, এটি ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একটি বড় প্রমাণ।”
উপসংহারে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের ব্যবহার একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তবে এই ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল পেতে হলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হ্রাস, ডাক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভোটারদের সঠিক নিয়ম মেনে ভোট দানে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ ভোট পড়ার হার প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে মানুষ গণতন্ত্র চর্চায় অংশ নিতে সর্বদা প্রস্তুত।
